শিরোনাম
ডেস্ক রিপোর্ট
প্রকাশ: ০৯:০৫, ৩ মার্চ ২০২৬
দিল্লিতে নরেন্দ্র মোদী এবং মার্ক কার্নির বৈঠকের পর ভারত ও কানাডা ১০ বছর মেয়াদি পারমাণবিক শক্তি চুক্তিসহ বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ সমঝোতার ঘোষণা দিয়েছে।
দিল্লিতে নরেন্দ্র মোদী এবং মার্ক কার্নির বৈঠকের পর ভারত ও কানাডা ১০ বছর মেয়াদি পারমাণবিক শক্তি চুক্তিসহ বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ সমঝোতার ঘোষণা দিয়েছে। কূটনৈতিক উত্তজনার কারণে দুই দেশের তলানিতে গিয়ে ঠেকা সম্পর্ক স্বাভাবিক করতেই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
প্রযুক্তি, গুরুত্বপূর্ণ খনিজ, মহাকাশ গবেষণা, প্রতিরক্ষা এবং শিক্ষা খাতেও নতুন চুক্তি সই করেছেন মোদী ও কার্নি। কানাডার প্রধানমন্ত্রী জানিয়েছেন, দীর্ঘ কয়েক বছর ধরে ঝুলে থাকা মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি ২০২৬ সালের শেষ নাগাদ চূড়ান্ত করতে তারা একমত হয়েছেন। মূলত যুক্তরাষ্ট্রের শাস্তিমূলক বাণিজ্য শুল্কের প্রভাব কমাতে দুই দেশই এই পারস্পরিক বাণিজ্যিক নির্ভরতা বাড়াতে চাইছে, খবর বিবিসির।
কার্নির নেতৃত্বে দুই দেশের সরকার সেই তিক্ততা কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করছে, যা তার পূর্বসূরি জাস্টিন ট্রুডোর সময় তৈরি হয়েছিল। ট্রুডো ২০২৩ সালে কানাডার মাটিতে শিখ বিচ্ছিন্নতাবাদী নেতা হারদীপ সিং নিজ্জর হত্যাকাণ্ডে ভারত সরকারের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ তুলেছিলেন। ভারত সরকার তীব্রভাবে সেই অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে। সেই সময় উভয় দেশ একে অপরের কূটনীতিকদের বহিষ্কার এবং ভিসা সেবা বন্ধ করে দিলে বাণিজ্যিক ও কূটনৈতিক সম্পর্ক প্রায় স্থবির হয়ে পড়েছিল।
তবে গত বছর কার্নি ক্ষমতা গ্রহণের পর থেকে সম্পর্কটি সতর্কতার সঙ্গে পুনর্গঠন করা হচ্ছে। কার্নি প্রশাসন জানিয়েছে, বর্তমানে কানাডার মাটিতে কোনো সহিংস অপরাধ বা হুমকির সঙ্গে ভারতের সম্পৃক্ততা আছে বলে তারা মনে করে না—যা সম্পর্ক উন্নয়নে সহায়ক হয়েছে। অবশ্য কার্নির নিজের দল লিবারেল পার্টির একজন সংসদ সদস্য এবং কানাডায় বসবাসরত শিখ প্রবাসীরা এই দাবির বিরোধিতা করেছেন। তাদের দাবি, তারা এখনো ভারতের লক্ষ্যবস্তু হিসেবে রয়ে গেছেন।
কানাডার গোয়েন্দা সংস্থা গত বছরের শেষ দিকে ভারতকেও রাশিয়া, চীন ও ইরানের পাশাপাশি বিদেশি হস্তক্ষেপ এবং গুপ্তচরবৃত্তি পরিচালনাকারী দেশ হিসেবে তালিকাভুক্ত করেছিল। গত সোমবার এক বিবৃতিতে কানাডিয়ান সিকিউরিটি ইন্টেলিজেন্স সার্ভিস (সিএসআইএস) জানিয়েছে, বিদেশি হস্তক্ষেপ নিয়ে তাদের মূল মূল্যায়নে কোনো পরিবর্তন আসেনি।
এদিকে, কানাডার একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা দাবি করেছিলেন যে ভারত দেশটিতে সব ধরণের হস্তক্ষেপ বন্ধ করেছে। তবে পররাষ্ট্রমন্ত্রী অনিতা আনন্দ সেই মন্তব্য থেকে দূরত্ব বজায় রেখে বলেছেন, ওই কর্মকর্তার ব্যবহৃত শব্দগুলো তিনি ব্যক্তিগতভাবে ব্যবহার করবেন না। অবশ্য ভারতের সঙ্গে পুনরায় সম্পর্ক স্থাপনের সিদ্ধান্তের পক্ষে যুক্তি দিয়ে তিনি বলেন, অগ্রগতি নিশ্চিত করতে কূটনৈতিক আলোচনা চালিয়ে যাওয়া প্রয়োজন।
ভারতের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকের পর কার্নি এখনও সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেননি। ব্যস্ত সূচির কারণ দেখিয়ে তার কার্যালয় নির্ধারিত সংবাদ সম্মেলন বাতিল করেছে। উল্লেখ্য, নিজ্জর হত্যাকাণ্ডে অভিযুক্ত চার ব্যক্তির বিচার প্রক্রিয়া এখনো আদালতে চলমান।
দিল্লিতে অনুষ্ঠিত বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী মোদী এবং কার্নি ভারত ও কানাডার দীর্ঘদিনের সম্পর্ক, পারস্পরিক লক্ষ্য এবং শক্তিশালী জনযোগাযোগের ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন। হায়দ্রাবাদ হাউসে বৈঠকের পর মোদী সাংবাদিকদের জানান, বেসামরিক পারমাণবিক শক্তির ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদী ইউরেনিয়াম সরবরাহের জন্য একটি যুগান্তকারী চুক্তি হয়েছে। এর পাশাপাশি দুই দেশ ছোট মডুলার রিঅ্যাক্টর এবং উন্নত রিঅ্যাক্টর নিয়েও একত্রে কাজ করবে।
প্রধানমন্ত্রী মোদী দুই দেশকে প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনের ক্ষেত্রে 'স্বাভাবিক অংশীদার' হিসেবে বর্ণনা করেন। তিনি জানান, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI), সুপারকম্পিউটিং এবং সেমিকন্ডাক্টর খাতে সহযোগিতা বৃদ্ধির পাশাপাশি তারা যৌথভাবে একটি নবায়নযোগ্য জ্বালানি সম্মেলন আয়োজন করবেন। অন্যদিকে, কার্নি উল্লেখ করেন যে ভারতের ক্রমবর্ধমান জ্বালানি চাহিদা মেটাতে কানাডা পারমাণবিক জ্বালানি সরবরাহে সক্ষম এবং দুই দেশ একটি কৌশলগত জ্বালানি অংশীদারিত্ব শুরু করতে যাচ্ছে।
সম্পর্ক পুনর্গঠনের অগ্রগতিকে স্বাগত জানিয়ে কার্নি বলেন, গত দুই দশকে যা হয়নি, গত এক বছরে ভারত ও কানাডা সরকারের মধ্যে তার চেয়ে বেশি যোগাযোগ হয়েছে। বাণিজ্যের বিষয়ে মোদী জানান, তাদের লক্ষ্য দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য ৫০ বিলিয়ন ডলারে নিয়ে যাওয়া, যার জন্য দ্রুত একটি ব্যাপক অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব চুক্তি চূড়ান্ত করার সিদ্ধান্ত হয়েছে। কার্নি এই উচ্চাভিলাষী চুক্তিটি বছরের শেষ নাগাদ সম্পন্ন করার ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন, যা গত ১৫ বছর ধরে ঝুলে ছিল।
বিশ্লেষকদের মতে, কূটনৈতিক উত্তেজনা সরিয়ে রেখে কার্নির এই বন্ধুত্বের হাত বাড়িয়ে দেওয়া বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে একটি বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ। ভারতের জন্যও এটি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ তারা আমদানিতে বৈচিত্র্য আনতে এবং জ্বালানির জন্য রাশিয়ার ওপর নির্ভরতা কমাতে নতুন বাণিজ্যিক অংশীদার খুঁজছে।
জরিপ অনুযায়ী, কানাডার অধিকাংশ নাগরিক ভারতের সঙ্গে পুনরায় সম্পর্ক স্থাপনের পক্ষে। অ্যাঙ্গাস রিড-এর সাম্প্রতিক এক জরিপে দেখা গেছে, অর্ধেক মানুষ মনে করেন সম্পর্ক পুনরুদ্ধারের এটাই সঠিক সময়। ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের শুল্ক নীতির চাপে থাকা কানাডীয়দের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের (২৬%) তুলনায় ভারতের (৩০%) প্রতি ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি বেশি দেখা গেছে।
সোমবার সকালে কার্নি ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্করের সঙ্গেও দেখা করেন এবং একটি 'ভবিষ্যৎমুখী অংশীদারিত্ব' নিয়ে আলোচনা করেন। ২৮ ফেব্রুয়ারি মুম্বাই সফরের মাধ্যমে কার্নির চার দিনের এই সফর শুরু হয়, যেখানে তিনি বিনিয়োগ বাড়াতে ব্যবসায়ী নেতা ও মন্ত্রীদের সঙ্গে বৈঠক করেন। দিল্লি সফর শেষে কার্নি বাণিজ্য বহুমুখীকরণ এবং নতুন বিনিয়োগ আকর্ষণের লক্ষ্যে অস্ট্রেলিয়া ও জাপানে যাওয়ার কথা রয়েছে।