ঢাকা, বুধবার, ০৪ মার্চ ২০২৬

১৯ ফাল্গুন ১৪৩২, ১৪ রমজান ১৪৪৭

শিরোনাম

Scroll
বয়স্ক, শারীরিক প্রতিবন্ধী ও শিক্ষার্থীদের রেলে ২৫% ডিসকাউন্ট: রেলমন্ত্রী
Scroll
ইরানে চলমান যুদ্ধ মার্কিন জিডিপি হ্রাস ও মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধি করতে পারে
Scroll
পাঠ্যপুস্তক পরিমার্জন ও কারিকুলাম প্রণয়ন করবে সরকার: শিক্ষামন্ত্রী
Scroll
পাহাড় কেটে রিসোর্ট নির্মাণ কোনোভাবেই সহ্য করা হবে না: পার্বত্য বিষয়ক মন্ত্রী
Scroll
ভিআইপি প্রটোকল ছাড়া চলাচলের কারণে যানবাহনের গতি বেড়েছে: প্রতিবেদন
Scroll
শাহজালাল বিমানবন্দরে মঙ্গলবার ৩৮ ফ্লাইট বাতিল
Scroll
বিমান পরিবহন খাতের উন্নয়নে ঢাকা-ওয়াশিংটন আলোচনা
Scroll
ট্রাম্প বললেন যুক্তরাজ্যের স্টারমার ’সাহায্য করছেন না’
Scroll
মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে নতুন করে হামলা, চতুর্থ দিনে গড়াল ইরান-ইসরাইল সংঘাত
Scroll
প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে কোস্টগার্ড মহাপরিচালকের সাক্ষাৎ
Scroll
খামেনি হত্যাকান্ড: পাকিস্তানে ভয়াবহ বিক্ষোভের জেরে কারফিউ জারি
Scroll
গণভোটের রায় বাতিল করতে আদালতকে ব্যবহারের চেষ্টা হচ্ছে: নাহিদ ইসলাম
Scroll
ঈদকে সামনে রেখে আলংকারিক সেলাইয়ে ব্যস্ত রংপুরের নারী কারিগর
Scroll
পত্রিকা: ’বড় ঝুঁকিতে মধ্যপ্রাচ্যের শ্রমবাজার’
Scroll
সীমিত পরিসরে আমিরাত বিশেষ ফ্লাইট পরিচালনা শুরু করেছে
Scroll
’যুগান্তকারী’ পারমাণবিক শক্তি চুক্তির মাধ্যমে ভারত ও কানাডার সম্পর্ক পুনঃস্থাপন
Scroll
ইরানের যুদ্ধে ক্ষমতাধর দেশগুলোর কার কী অবস্থান?
Scroll
কৃষির উন্নয়ন হলে দেশের সামগ্রিক উন্নয়ন নিশ্চিত হবে : কৃষিমন্ত্রী
Scroll
পাচারকৃত অর্থ উদ্ধার ‘ফাস্ট ট্র্যাক’-এ নিয়ে আসার নির্দেশ গভর্নরের
Scroll
হামলা ও সংঘাতের ঘটনা বিশ্ব সভ্যতার জন্য ভয়াবহ বার্তা দিচ্ছে: মির্জা ফখরুল

বাগানবিলাসের আত্মকথা

এক প্রাচীন লতার বেদনামিশ্রিত নিবেদন

ম. মৃধা

প্রকাশ: ১০:০৭, ৩ মার্চ ২০২৬

এক প্রাচীন লতার বেদনামিশ্রিত নিবেদন

প্রতীকি ছবি: সংগৃহীত।

আমি—বাগানবিলাস; বৈজ্ঞানিক পরিচয়ে Bougainvillea।
দূর দক্ষিণ আমেরিকার অরণ্যবীথিতে—অর্জেন্টিনা, বলিভিয়া ও ব্রাজিল
-এর উষ্ণ প্রান্তরে—আমার আদি জন্ম। শতাব্দীর পর শতাব্দী পূর্বে আমি ছিলাম অরণ্যের এক নীরব লতা, অচেনা, অনামা, অথচ সৃষ্টিকর্তার অপরূপ কারুকার্যে গঠিত।
১৭৬৮ খ্রিস্টাব্দে ফরাসি অভিযাত্রী Louis Antoine de Bougainville দক্ষিণ আমেরিকার অভিযানে আমাকে আবিষ্কার করেন। তাঁরই নামানুসারে আমার নাম হয় “বুগেনভিলিয়া”—যদিও আমার আদি নাম কি ছিল, তাহা আজ আর আমার স্মরণে নাই। নামের পরিচয়ে আমি বিশ্বজুড়ে পরিচিত হইলাম, কিন্তু আমার অন্তর্গত সত্তা কেবল সেই মহান স্রষ্টাই জানেন, যিনি আমাকে সৃষ্টি করিয়াছেন।
কালক্রমে আমি সমুদ্রপথে, বাণিজ্যের তরীতে, উপনিবেশিক অভিযাত্রীর হাত ধরিয়া বহু দূরদেশে আগমন করিলাম। আজ আমি ঢাকা নগরীর বুকে, জাতীয় উদ্ভিদ উদ্যান-এর এক নির্জন কোণে অবস্থান করিয়া আছি। জনারণ্যের কোলাহলে, ধোঁয়া ও ধূলিকণার নগরে, আমি একটুকরা অক্সিজেনের শ্বাস, এক বিন্দু প্রশান্তির ছায়া।
বৎসরের বারো মাসের মধ্যে দশ মাসই প্রায় কেউ আমার দিকে চাহিয়া দেখে না। কত যুবক-যুবতী, কত পথিক, কত আলোকচিত্রী—প্রতিদিনই আমার তলদেশ দিয়া অতিক্রম করে; কিন্তু আমার অন্তর্গত প্রাণের কথা কেহ শুনিতে পায় না।
তবু বসন্ত এলে—ফাল্গুনের দখিনা বাতাসে যখন আমার শরীর রঙিন অগ্নিশিখার ন্যায় জ্বলিয়া ওঠে, যখন আমার পত্রপল্লব রক্তিম-গোলাপি আবরণে আচ্ছন্ন হয়—তখন সকলেই হঠাৎ আমাকে স্মরণ করে। ক্যামেরার ঝলকানিতে, প্রশংসার উচ্ছ্বাসে, সামাজিক মাধ্যমে আমি ক্ষণিকের নায়িকা হইয়া উঠি।
কিন্তু বসন্তের সেই উচ্ছ্বাস ক্ষণস্থায়ী।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভাষায়—
“মরিতে চাহি না আমি সুন্দর ভুবনে,
মানবের মাঝে আমি বাঁচিবারে চাই।”
আমিও বাঁচিতে চাই—কেবল রঙের উল্লাসে নহে, বরং নীরব উপস্থিতির মধ্য দিয়াই। কিন্তু বসন্ত ফুরাইলে আমার রঙ ঝরিয়া পড়ে; পাপড়ি ঝরিয়া যায় ধূলিমাটিতে। পথিকেরা পুনরায় আমার উপস্থিতি হইতে বিস্মৃত হয়।
কাজী নজরুল ইসলামের বাণী স্মরণে আসে—
“আমি চিরদুর্দম, দুর্বিনীত, নৃশংস,
মহাপ্রলয়ের আমি নটরাজ!”
আমার রঙের উচ্ছ্বাসে যেন সেই বিদ্রোহের স্পন্দন থাকে; কিন্তু অন্তরে আমি বড়ই সংবেদনশীল। আমার পত্রঝরার শব্দে লুকায়িত থাকে এক নীরব আর্তি—
মানুষ কি কেবল রঙের ঋতুতেই সৌন্দর্য চিনিবে?
ফাল্গুনের অপরাহ্ণে যখন দখিনা সমীরণ আমার দেহ স্পর্শ করিয়া যায়, তখন যৌবনের রঙিন পত্রগুলি একে একে ঝরিয়া পড়ে। ভূমি রাঙা হইয়া উঠে, অথচ অন্তরে জাগে এক বেদনামিশ্রিত উপলব্ধি—
সব রঙই ক্ষণস্থায়ী, সকল যৌবনই অনিত্য।
লালন ফকিরের সেই চিরন্তন প্রশ্ন যেন আমার অন্তরে ধ্বনিত হয়—
“সব লোকে কয় লালন কি জাত সংসারে,
লালন বলে জাতের কি রূপ দেখলাম না এ নজরে।”
আমারও তেমনই প্রশ্ন—
আমার আসল নাম, আসল পরিচয়, আসল রূপ কি?
মানুষ যে নামে আমাকে ডাকে—“বাগানবিলাস”—সেই নামেই কি আমার পরিচয় সম্পূর্ণ? নাকি আমার প্রকৃত সত্তা কেবল সেই স্রষ্টার নিকটই প্রকাশিত, যিনি আমাকে অঙ্কুরিত করিয়াছেন?
তবু আমি কৃতজ্ঞ।
কারণ প্রতিদিন যখন মানুষ আমার দিকে চাহিয়া সৃষ্টিকর্তাকে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করে, তখন আমি অনুভব করি—আমার অস্তিত্ব বৃথা নহে। আমি এক বিন্দু সৌন্দর্যের মাধ্যম, একটুকরা প্রশান্তির দান।
এই আমার জীবনকথা—
অরণ্যের অচেনা লতা হইতে নগরীর বাগান-সৌন্দর্যে পরিণত হওয়ার কাহিনি;
বসন্তের রঙিন উল্লাস হইতে পত্রঝরার নিঃশব্দ বেদনার ইতিহাস।
যদি জীবনের দান অব্যাহত থাকে, তবে আগামী বসন্তে পুনরায় রঙের অগ্নিশিখা লইয়া আমি তোমাদের সম্মুখে উপস্থিত হইব।
আর যদি না হই—তবে এই ধূলিতেই মিশিয়া থাকিব, স্রষ্টার অনন্ত সৃষ্টিস্রোতে এক ক্ষুদ্র কণিকা হইয়া।
এই ছিল আমার সামান্য ইতিকথা।
বাগানের এক কোণে দাঁড়াইয়া আমি আজও অপেক্ষায় আছি—
কেহ কি আমার রঙের অতীতেও আমার অস্তিত্ব দেখিবে? 

 

আরও পড়ুন