শিরোনাম
বিজবাংলা ফিচার ডেস্ক
প্রকাশ: ১৬:১৯, ১৯ মার্চ ২০২৬
ছবি: নিউ ইয়র্ক টাইমসের সৌজন্যে।
ক্লো লেগ্রাস যখন নেভাদার রেনোতে একটি হোম গুডস বা ঘর সাজানোর জিনিসের দোকান চালাতেন, তখন তিনি তার বিক্রি করা পণ্যগুলো কাগজের ব্যাগে ভরে দিতেন। সেই ব্যাগের গায়ে একটি বার্তা লেখা থাকত: "আপনার আরও বেশি কিছুর প্রয়োজন নেই, আপনার প্রয়োজন অর্থপূর্ণ কিছুর।"
সম্প্রতি তিনি স্মৃতিচারণ করে জানান, তখন তার কিছু বন্ধুর প্রতিক্রিয়া ছিল এমন: "তোমার মুখে এই কথা মানায় না।" সেই সময় মিস লেগ্রাস তার তৎকালীন স্বামীর সাথে উত্তর ক্যালিফোর্নিয়ার ১৬৭,০০০ একরের একটি গবাদি পশুর খামারে থাকতেন, যেখানে তার শ্বশুরবাড়ি গত ১৫০ বছরেরও বেশি সময় ধরে বসবাস করছিল। জিনিসপত্র জমিয়ে রাখার জন্য সেখানে তার হাতে ছিল বিশাল জায়গা। একজন সৃজনশীল এবং সেলাই মেশিনে দক্ষ শৌখিন মানুষ হিসেবে তিনি কেবল সুন্দর জিনিস সংগ্রহ করতেই নয়, বরং সেগুলো তৈরি করতেও পছন্দ করতেন।
তবে বছর দুয়েক আগে তার বৈবাহিক সম্পর্কের বিচ্ছেদ ঘটে। এখন ৩৩ বছর বয়সী মিস লেগ্রাস তখন সেই ব্যাগের লেখা উপদেশটি নিজে মেনে চলার সিদ্ধান্ত নেন। তিনি তার দোকান বন্ধ করে দেন, সব আসবাবপত্র স্টোরেজে রাখেন এবং ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে প্যারিসের মারাইস (Marais) ডিস্ট্রিক্টে ৪০০ বর্গফুটের একটি অ্যাপার্টমেন্টে চলে আসেন, ফিচার দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমসের।
প্রাচীন ছাদের বিম এবং পোড়ামাটির মেঝের টাইলস সমৃদ্ধ সেই ছোট্ট একটি ঘরেই এখন তিনি খাওয়া-দাওয়া, ঘুমানো এবং যোগব্যায়াম করেন। সেখান থেকেই তিনি 'বক্সউড অ্যাভিনিউ' (Boxwood Avenue) নামক একটি কোম্পানি পরিচালনা করেন, যা একইসাথে একটি ডিজাইন স্টুডিও, ই-কমার্স ব্যবসা, ইনফ্লুয়েন্সার প্ল্যাটফর্ম এবং ফ্রান্স, যুক্তরাজ্য ও ইতালিতে শপিং ট্রিপ আয়োজনকারী প্রতিষ্ঠান।
মিস লেগ্রাসের ক্যালিফোর্নিয়ার খামার থেকে প্যারিসের এই জীবনে চলে আসার পেছনে কিছুটা পারিবারিক টানও ছিল। তার দাদা ফ্রান্সের ওত-সাভোয়া (Haute-Savoie) অঞ্চল থেকে সান ফ্রান্সিসকোতে পাড়ি জমিয়েছিলেন। রেনো এলাকায় বেড়ে ওঠা ক্লো কিশোর বয়সে তার এক প্রিয় খালার সাথে প্রথমবার ফ্রান্সে ঘুরতে আসেন। সেই খালাই তাকে একটি সেলাই মেশিন কিনে দিয়েছিলেন, যা তাকে কলেজে পড়ার সময় একটি এটসি (Etsy) শপ খুলতে উৎসাহিত করে। সেখানে তিনি হাতে তৈরি বালিশ এবং অ্যাপ্রন বিক্রি করতেন।
স্নাতক শেষ করার পরপরই বিয়ে করে তিনি সেই খামারে তার হস্তশিল্পের ব্যবসা চালিয়ে যান। সেখানে তিনি মুরগির ডিমের ওপর বার্তা ছাপানোর জন্য রাবার স্ট্যাম্প তৈরির কাজ শুরু করেন। নিজের খামারের ঘরটি তিনি নিজেই সাজিয়েছিলেন এবং তার ফলাফল সোশ্যাল মিডিয়ায় পোস্ট করতেন। এটি ২০১৮ সালে একজন রিয়েলিটি টেলিভিশন শো প্রযোজকের নজরে আসে, যিনি ঘর সংস্কারের ওপর একটি সিরিজের পাইলট পর্ব তৈরি করছিলেন। যদিও সেই শো শেষ পর্যন্ত সফল হয়নি, তবে এটি মিস লেগ্রাসকে ইন্টেরিয়র ডিজাইনার হিসেবে একটি নতুন পেশাদার দিকনির্দেশনা দেয়, যেখানে তার বিশেষ আগ্রহ ছিল পুরনো এবং দুর্লভ জিনিস (antiques) খুঁজে বের করা। এরপর তিনি অনলাইন ব্যবসা হিসেবে 'বক্সউড অ্যাভিনিউ' প্রতিষ্ঠা করেন এবং মালামাল সংগ্রহের জন্য ঘনঘন প্যারিসের পুরনো জিনিসের বাজারে যেতেন। ২০২১ সালে তিনি রেনোতে তার নিজস্ব স্টোর খোলেন।
প্যারিসে স্থায়ী হওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় মিস লেগ্রাস প্রথমে মারাইস ডিস্ট্রিক্টে থাকার পরিকল্পনা করেননি। তার বন্ধুদের বেশিরভাগই লেফট ব্যাংকের সেন্ট-জার্মেইন-ডেস-প্রিস এলাকায় থাকতেন। তবে দীর্ঘমেয়াদী ভাড়ার জন্য এয়ারবিএনবি (Airbnb) খুঁজতে গিয়ে তিনি 'প্লেস ডি ভোজ'-এর কয়েক ব্লক পশ্চিমে একটি ভবনের তিনতলায় এই অদ্ভুত সুন্দর ছোট অ্যাপার্টমেন্টটি খুঁজে পান। ১৫ থেকে ১৭ শতকের স্থাপত্যশৈলী সমৃদ্ধ এলাকাটি শহরের পুরনো ইহুদি পাড়া হিসেবে পরিচিত।
এই অ্যাপার্টমেন্টের জন্য মিস লেগ্রাস প্রতি মাসে ২,৬০০ ইউরো (প্রায় ৩,০০০ ডলার) ভাড়া দেন। তিনি জানান, এর উঁচু ছাদ এবং পুরনো কাঠের বিম তাকে মুগ্ধ করেছে। ঘরে পৌঁছানোর জন্য নড়বড়ে সিঁড়িগুলো তিনি মেনে নিয়েছেন। বিছানার ওপর ঝোলানো গ্রাম্য দৃশ্যের ট্যাপেস্ট্রি কিংবা জানালার ফুলকাটা পর্দা নিয়ে তার কোনো অভিযোগ নেই। দেয়ালের হালকা সবুজ রঙ যে অ্যাপার্টমেন্টটিকে সংকীর্ণ না দেখিয়ে বরং আরামদায়ক করে তুলেছে, এতে তিনি বেশ আনন্দিত।
নিজের জিনিসপত্র থেকে ৫,০০০ মাইল দূরে থাকলেও, তিনি পুরনো জিনিসের বাজার (flea markets) থেকে সংগ্রহ করা রুপোর পাত্র এবং কাঁচের তৈজসপত্র দিয়ে ঘরটি সাজিয়ে তুলেছেন। তিনি ঘরে স্টোরেজ বাস্কেট এবং ফুলের গাছ যুক্ত করেছেন এবং অ্যাপার্টমেন্টের বিছানার চাদর বদলে নিজের লিনেন ব্যবহার করছেন, যার মধ্যে তার অনলাইন শপে বিক্রি হওয়া বালিশও রয়েছে।
বিছানার এই পরিবর্তন সম্পর্কে তিনি তার ইনস্টাগ্রাম অনুসারীদের জানিয়েছিলেন। তিনি বলেন, “সবাই এই বিষয়টি নিয়ে আমাকে বেশ কথা শুনিয়েছে, কিন্তু আমি এসব ব্যাপারে খুব খুঁতখুঁতে।”
মিস লেগ্রাস বাথরুম এবং টয়লেটের উপরের দেয়ালে খোদাই করা ছোট ছোট কুঠুরিতে জিনিস রাখার জায়গা করে নিয়েছেন। তিনি বলেন, “আমি জায়গার ব্যবহারের ক্ষেত্রে খুব সৃজনশীল হয়ে উঠেছি।”
নিজের ঘরে কী আনছেন সে ব্যাপারে সচেতন থাকা তাকে ক্লায়েন্টদের জন্য আরও কার্যকরভাবে ডিজাইন করতে সাহায্য করে। তিনি উল্লেখ করেন যে, পুরনো বাজারের জিনিসপত্র তিনি এই কারণেই পছন্দ করেন কারণ সেগুলো টিকে থাকার মাধ্যমেই নিজেদের গুণমানের প্রমাণ দিয়েছে।
তিনি অন্তত এই বছরের শেষ পর্যন্ত এখানেই থাকার পরিকল্পনা করছেন এবং তার বর্তমান অবস্থা তার প্রত্যাশার চেয়েও অনেক বেশি সন্তোষজনক। তিনি বলেন, “সেদিন আমি আমার ছোট সোফা আর বিছানার মাঝখানের মেঝেতে যোগব্যায়াম করছিলাম। সেই সময় আমার মনে পড়ল, আমি একসময় ভাবতাম আমার বাগান, আমার বাড়ি আর আগের জীবন ছাড়া আমি কীভাবে বাঁচব। সেই জীবন ছেড়ে আসাটা কঠিন সিদ্ধান্ত ছিল। কিন্তু আমি উপলব্ধি করলাম যে, ফ্রান্সে থেকেও আমি ঠিক ততটাই সুখী।”