ঢাকা, শনিবার, ০৭ মার্চ ২০২৬

২২ ফাল্গুন ১৪৩২, ১৭ রমজান ১৪৪৭

শিরোনাম

Scroll
গণমাধ্যম শিল্প বাঁচাতে সাংবাদিকদের সম্মানজনক ওয়েজবোর্ড জরুরি: তথ্যমন্ত্রী
Scroll
চীনকে দোলাচলে ফেলছে ইরান যুদ্ধ
Scroll
যানবাহনভিত্তিক জ্বালানি তেল সরবরাহে রেশনিং করেছে সরকার
Scroll
দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক শক্তিশালী করতে সরকার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ: প্রধানমন্ত্রী
Scroll
র‍্যাপার থেকে রাজনীতিবিদ: নেপালের প্রধানমন্ত্রী হতে যাচ্ছেন বালেন্দ্র শাহ
Scroll
বিএনপি সংসদ সদস্যদের প্রশিক্ষণ কর্মশালা উদ্বোধন প্রধানমন্ত্রীর
Scroll
দিনাজপুর সীমান্তে তেল পাচার রোধে বিজিবি নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার
Scroll
লিবিয়া থেকে ফিরেছেন ১৬৫ জন বাংলাদেশি
Scroll
নীরবতা শব্দের অনুপস্থিতি নয়, এটি বরং গভীর অর্থবহ বিষয়: মনোবিজ্ঞানী লরেন্স জোসেফ
Scroll
পাটপণ্যকে বিশ্বে ছড়িয়ে দিয়ে নতুন সম্ভাবনা ও সুবর্ণ সুযোগ কাজে লাগান: রাষ্ট্রপতি
Scroll
সাফল্যে দেখাচ্ছে ‘ই-বেইলবন্ড’, আরও ৭ জেলায় চালুর উদ্যোগ
Scroll
ইউরোপের বনাঞ্চল ঝুঁকির মুখে, সতর্ক বার্তা বিজ্ঞানীদের
Scroll
পত্রিকা: ’রেশনিং করে জ্বালানি সংকট মোকাবেলার লক্ষ্য সরকারের’
Scroll
যুদ্ধের প্রভাব: বাংলাদেশে জ্বালানি, রেমিটেন্স, খাদ্যপণ্যের বাজার নিয়ে শঙ্কা
Scroll
‘ডুমসডে’ পারমাণবিক ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা করল যুক্তরাষ্ট্র
Scroll
ইরান আর আমেরিকার অস্ত্রভাণ্ডার কি কমে আসছে?
Scroll
অতিরিক্ত ভাড়া নিলে ব্যবস্থা, নিরাপদ ঈদযাত্রায় সর্বোচ্চ প্রস্তুতি রয়েছে সরকারের
Scroll
ইরান ও উপসাগরজুড়ে নতুন হামলা, আরও বিস্তৃত হচ্ছে যুদ্ধ
Scroll
স্বাস্থ্যখাতে ধাপে ধাপে এক লাখ জনবল নিয়োগ দেওয়া হবে: স্বাস্থ্যমন্ত্রী
Scroll
জাকজমকপূর্ণ ইফতার মাহফিল এড়িয়ে চলার সিদ্ধান্ত প্রধানমন্ত্রীর

নীরবতা শব্দের অনুপস্থিতি নয়, এটি বরং গভীর অর্থবহ বিষয়

বিজবাংলা ফিচার ডেস্ক

প্রকাশ: ১৮:৪০, ৬ মার্চ ২০২৬

নীরবতা শব্দের অনুপস্থিতি নয়, এটি বরং গভীর অর্থবহ বিষয়

প্রতীকি ছবি: সংগৃহীত।

লোরেন্স জোসেফ, একজন ফরাসি মনোবিশ্লেষক এবং ক্লিনিকাল সাইকোলজিস্ট, তার বই 'Nos silences: Apprendre à les écouter' (আমাদের নীরবতা: তাদের শুনতে শেখা)-এ নীরবতার বিভিন্ন রূপ নিয়ে আলোচনা করেছেন। তার মতে, আজকের সমাজে চুপ থাকা মানেই শোনার ক্ষমতা অর্জন করা, যা বর্তমানে বেশ বিরল। কুড়ি বছরেরও বেশি সময়ের থেরাপিউটিক অভিজ্ঞতা থেকে তিনি দেখিয়েছেন যে, নীরবতা কেবল শব্দের অনুপস্থিতি নয়, বরং এটি গভীর অর্থবহ একটি বিষয়।

জোসেফ নীরবতাকে বিভিন্নভাবে ভাগ করেছেন। কিছু নীরবতা ভুক্তভোগীদের রক্ষা করে, আবার কিছু নীরবতা অপরাধীদের আড়াল করে। কোনো লজ্জাজনক গোপন তথ্য লুকিয়ে রাখলে সেই নীরবতা সময়ের সাথে সাথে বিষাক্ত হয়ে উঠতে পারে, ফিচার লেখাটি এল পাইজ পত্রিকার (মার্চ ৪, ২০২৬) ।

আজকের হাইপার-কানেক্টেড বিশ্বে নীরবতা একদিকে যেমন বিলাসিতা (যেমন নয়েজ-ক্যানসেলিং হেডফোন বা মেডিটেশন), অন্যদিকে এটি একাকী মানুষের জন্য এক বিশাল অরক্ষিত জায়গার মতো।

মনোবিশ্লেষণে 'সাইলেন্ট লিসেনিং' বা নীরব শ্রোতা হওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। জোসেফ ব্যাখ্যা করেন যে, যখন একজন ব্যক্তি অন্যের সামনে নীরব থাকেন, তখনই অপরজন নিজের গল্প বলার সুযোগ পান। এটি অন্যকে নিজের চিন্তা প্রকাশের জায়গা করে দেওয়ার একটি প্রক্রিয়া।

জোসেফের বইয়ের প্রেক্ষাপটে Apprendre এর অর্থ হলো একটি প্রক্রিয়া। তিনি বোঝাতে চেয়েছেন যে, নীরবতা কোনো শূন্যতা নয়, বরং এটি একটি ভাষা যা আমাদের নতুন করে শিখতে হয়। আমরা সাধারণত কথা বলতেই শিখি, কিন্তু লোরেন্স জোসেফ বলছেন আমাদের 'চুপ থাকতে' এবং সেই নিস্তব্ধতার পেছনের অর্থ 'বুঝতে' শিখতে হবে।

সহজ কথায়, তার বইয়ের শিরোনামের অর্থ দাঁড়ায়: "আমাদের নীরবতা: তাদের (মনোযোগ দিয়ে) শুনতে শেখা।"

তার প্র্যাকটিসে তিনি অনেক অস্বস্তিকর নীরবতার মুখোমুখি হয়েছেন, বিশেষ করে যৌন সহিংসতা বা ইনসেস্টের শিকার হওয়া শিশুদের ক্ষেত্রে। তিনি মনে করেন, শিশু এবং নারীদের কথা না শুনতে চাওয়ার প্রবণতা থেকেই এই নীরবতার সৃষ্টি হয়। তবে বর্তমানে এই পরিস্থিতির পরিবর্তন ঘটছে। ভ্যানেসা স্প্রিঙ্গোরার 'Consent' বইটির মতো উদাহরণ টেনে তিনি দেখান যে, কীভাবে সাহসিকতার সাথে কথা বললে লজ্জার দেয়াল ভেঙে যায়।

জোসেফ ফরাসি দার্শনিক রোল্যান্ড বার্থের উদ্ধৃতি দিয়ে বলেন, নীরবতা আসলে নিরপেক্ষ। মানুষ নিজের মতো করে এটিকে ব্যবহার করে এবং রাজনৈতিক অর্থ দেয়। #MeToo আন্দোলনের মতো ঘটনাগুলো প্রমাণ করে যে, যখন মানুষ তাদের গোপন কথাগুলো শেয়ার করতে শুরু করে, তখন সামাজিক নীরবতা ভেঙে পড়ে এবং পরিবর্তনের সূচনা হয়।

লোরেন্স জোসেফের আলোচনার এই পর্যায়ে নীরবতার বিষয়টি আরও গভীরে প্রবেশ করে, যেখানে এটি কেবল ট্রমা বা আঘাতের বিষয় নয়, বরং আমাদের সামাজিক ও ব্যক্তিগত জীবনের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে ধরা দেয়।
নীরবতা যখন রাজনৈতিক ও সামাজিক হাতিয়ার

স্পেনের ক্যাথলিক চার্চের ভেতরে ঘটে যাওয়া নির্যাতনের তদন্তের উদাহরণ দিয়ে জোসেফ দেখান যে, দীর্ঘদিনের নীরবতা ভাঙার একটি অনস্বীকার্য রাজনৈতিক মাত্রা রয়েছে। যখন এই 'সামাজিক মূকত্ব' বা 'Social Muteness' ভেঙে যায়, তখন একের পর এক ব্যক্তিগত গোপন গল্পগুলো প্রকাশ্যে আসতে শুরু করে। এটি কেবল ব্যক্তিগত মুক্তি নয়, বরং একটি প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিতারও প্রক্রিয়া।
কোলাহলের যুগে নীরবতার প্রয়োজনীয়তা

কর্মক্ষেত্রে আজকের হাইপার-কানেক্টেড বিশ্বে আমরা সবসময় কথা বলতে বা প্রতিক্রিয়া জানাতে বাধ্য হচ্ছি। সোশ্যাল মিডিয়ার প্রভাবে প্রতিটি বিষয়ে মতামত দেওয়া এখন একটি অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। জোসেফ একে এক ধরণের 'মানসিক ওভারলোড' হিসেবে দেখান। অতিরিক্ত মিটিং থেকে শুরু করে বিনোদনের অসংখ্য মাধ্যম—সব মিলিয়ে আমাদের মস্তিষ্ক প্রতিনিয়ত উদ্দীপনার শিকার হচ্ছে, যার জন্য আমরা আসলে প্রস্তুত নই।
জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে নীরবতার ভিন্ন অর্থ

বয়স এবং পরিস্থিতির ভেদে নীরবতার মানে বদলে যায়:

    মায়েদের জন্য: এটি এক মুহূর্তের শান্তি বা আশীর্বাদ।

    বৃদ্ধদের জন্য: এটি চরম একাকীত্বের প্রতীক। জোসেফ তার নিজের ৯০ বছর বয়সী দাদীর কথা স্মরণ করে বলেন, কেউ ফোন না করলে তার সারাদিন কাটত নিশ্ছিদ্র নিস্তব্ধতায়।

    পরিবারে: পরিবারের ভেতরে কিছু গোপনীয়তা থাকে যা নৈতিক ঐক্যের কাজ করে। মৃত্যু, অসুস্থতা বা বংশপরিচয় নিয়ে কিছু গোপন কথা কেবল নির্দিষ্ট গণ্ডির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে।

প্রেম ও যৌনতায় নীরবতার ভূমিকা

জোসেফ মনে করেন, প্রেমের ক্ষেত্রে গোপনীয়তা বা নীরবতা একটি বিশেষ মাত্রা যোগ করে। সমকামিতা, বিবাহবহির্ভূত সম্পর্ক বা বয়সের ব্যবধানের কারণে অনেক সময় সম্পর্কগুলো 'অকথ্য' বা সবার আড়ালে থেকে যায়। তিনি প্রশ্ন তোলেন—সাক্ষীহীন প্রেম কি আরও তীব্র হয়, নাকি তা স্রেফ একটি বিভ্রমে পরিণত হয়?

তিনি অ্যানি এরনোর 'Simple Passion' উপন্যাসের উদাহরণ দেন, যেখানে মূল চরিত্রটি একজন বিদেশি বিবাহিত পুরুষের সাথে তার সম্পর্কের গোপনীয়তা ও নীরবতাকে মেনে নেয়। তাদের মাঝে কোনো সাধারণ ভাষা নেই, তাই তাদের শরীরই হয়ে ওঠে একে অপরের সাথে যোগাযোগের একমাত্র মাধ্যম বা অভিধান।
ব্লেইজ প্যাসকেলের সেই বিখ্যাত উক্তি—“মানবজাতির সকল সমস্যার মূল হলো মানুষের একটি ঘরে একা শান্ত হয়ে বসে থাকতে না পারা”—জোসেফ তার বইয়ে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে উল্লেখ করেছেন। তবে তিনি এই ধারণার একটি চমৎকার ভিন্নধর্মী বিশ্লেষণও দিয়েছেন।

জোসেফের মতে, প্যাসকেলের এই তত্ত্বে একটি সীমাবদ্ধতা আছে—তিনি অন্যের গুরুত্ব বা উপস্থিতিকে ভুলে গেছেন। প্যাসকেলের এই নীরবতা মূলত প্রার্থনা, বিশ্বাস বা ধ্যানের সাথে যুক্ত, যা কিছুটা পুরুষতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে আসা।

এর বিপরীতে জোসেফ নিয়ে এসেছেন ভার্জিনিয়া উলফের 'A Room of One's Own' (নিজের একটি ঘর) ধারণাটি। তার বিশ্লেষণগুলো নিচে সংক্ষেপে তুলে ধরা হলো:

    দৃষ্টিভঙ্গির পার্থক্য: প্যাসকেলের কাছে নির্জনতা ছিল আধ্যাত্মিক সাধনা, কিন্তু উলফের কাছে এটি ছিল সৃজনশীল স্বাধীনতা এবং আত্মপরিচয় খোঁজার জায়গা।

    নারীবাদী প্রেক্ষাপট: জোসেফ মনে করেন, নারীদের জন্য একাকীত্ব বা নীরবতা সবসময় সহজলভ্য ছিল না। সাংসারিক ও সামাজিক দায়বদ্ধতার কারণে নারীরা জীবনের অনেক পরে এসে নিজের জন্য একটু নিরিবিলি সময় বা 'একান্ত ঘর' পায়। তাই তাদের কাছে এই নীরবতা কোনো শাস্তি নয়, বরং একটি বড় আশীর্বাদ।

    নির্জনতা বনাম একাকীত্ব: প্যাসকেল যেখানে একা থাকাকে একটি চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখেছেন, জোসেফ এবং উলফ সেখানে দেখিয়েছেন যে নিজের সাথে সময় কাটানো কীভাবে একজন ব্যক্তিকে মানসিকভাবে সমৃদ্ধ করতে পারে।

জোসেফ মূলত এটিই বোঝাতে চেয়েছেন যে, নীরবতা কেবল শূন্যতা নয়; এটি কার জন্য এবং কোন পরিস্থিতিতে ঘটছে, তার ওপর ভিত্তি করে এর অর্থ বদলে যায়।

 

আরও পড়ুন