শিরোনাম
ডেস্ক রিপোর্ট
প্রকাশ: ১৪:১০, ১২ ডিসেম্বর ২০২৫ | আপডেট: ১৪:১৪, ১২ ডিসেম্বর ২০২৫
থাইল্যান্ডের সংসদ ভবন। ছবি: সংগৃহীত।
থাই প্রধানমন্ত্রী অনুতিন চার্নভিরাকুল জোর দিয়ে বলেছেন যে সংসদ ভেঙে দেওয়ার সিদ্ধান্ত চলমান সীমান্ত সংঘাতের ব্যবস্থাপনাকে প্রভাবিত করবে না। কারণ হিসেবে তিনি বলেছেন যে, সংসদ ভেঙে দেওয়ার পরে, তিনি একটি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের নেতৃত্ব দেবেন, যার ক্ষমতা সীমিত থাকবে। তবে, তিনি নিশ্চিত করেছেন যে সামরিক অভিযানের ব্যবস্থাপনা ও সীমান্ত পরিচালনার ক্ষেত্রে এই পদক্ষেপের কোনো প্রভাব পড়বে না।
জাতীয়তাবাদী মনোভাব: কিছু বিশ্লেষক মনে করেন, সীমান্ত সংঘাতের মধ্যে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলে, এটি একটি "খাকি নির্বাচন" (যুদ্ধ বা সংঘাতের সময় নির্বাচন) হতে পারে। এর মাধ্যমে অনুতিন তার ভাবমূর্তি একজন সার্বভৌমত্বের রক্ষক হিসেবে তুলে ধরার সুযোগ পেতে পারেন, যা ভোটারদের মধ্যে জাতীয়তাবাদী মনোভাব জাগিয়ে তুলতে পারে এবং তার রাজনৈতিক সমর্থন বাড়াতে পারে, খবর ডিডাব্লিউ-এর।
কঠোর সামরিক অবস্থান: অনুতিন ইতিমধ্যেই একটি কঠোর সামরিক অবস্থান গ্রহণ করেছেন এবং থাই সার্বভৌমত্ব নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত লড়াই চালিয়ে যাওয়ার অঙ্গীকার করেছেন। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের নেতৃত্বেও এই অবস্থান বজায় থাকার সম্ভাবনা রয়েছে।
সংক্ষেপে, যদিও প্রধানমন্ত্রী বলেছেন এটি ব্যবস্থাপনাকে প্রভাবিত করবে না, তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন যে এই সংঘাতের সময় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলে তা প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক অবস্থানকে শক্তিশালী করতে পারে, কারণ তিনি নিজেকে জাতীয় নিরাপত্তার প্রবক্তা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করতে পারেন।
অনুতিন কেন সংসদ ভেঙে দিলেন?
প্রধানমন্ত্রী অনুটিন চার্নভিরাকুল সংসদ ভেঙে দেওয়ার কারণগুলো মূলত অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক চাপ এবং স্থিতিশীলতার অভাব:
আস্থা ভোটের হুমকি: অনুটিন তার কনজারভেটিভ ভূমজথাই পার্টির একজন সদস্য এবং তিনি পার্লামেন্টে একটি সংখ্যালঘু সরকারের নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন। বিরোধী দল, পিপলস পার্টি, তার বিরুদ্ধে অনাস্থা ভোটের হুমকি দিয়েছিল।
রাজনৈতিক অচলাবস্থা: রাজকীয় গেজেটে বলা হয়েছে যে "প্রশাসন একটি সংখ্যালঘু সরকার হওয়ায় এবং অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে একাধিক চ্যালেঞ্জ থাকায়, সরকার ক্রমাগত, দক্ষতার সাথে এবং স্থিতিশীলতার সাথে রাষ্ট্রীয় বিষয় পরিচালনা করতে পারবে না।" এই কারণে নতুন নির্বাচনই উপযুক্ত সমাধান।
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট: অনুতিন তার পূর্বসূরি পেতোংটার্ন শিনাওয়াত্রাকে অপসারণের পর সেপ্টেম্বরে ক্ষমতায় এসেছিলেন। পেতোংটার্ন কম্বোডিয়ার প্রাক্তন নেতা হুন সেনের সাথে তার সম্পর্কের বিষয়ে নৈতিকতার লঙ্ঘনের জন্য অপসারিত হন। অনুতিন পিপলস পার্টির সমর্থনে ক্ষমতায় এসেছিলেন এই শর্তে যে তিনি কয়েক মাসের মধ্যে সংসদ ভেঙে দেবেন এবং একটি নতুন সংবিধানের জন্য গণভোট আয়োজন করবেন।
চুক্তি লঙ্ঘন: পিপলস পার্টির সাথে অনুটিনের দল সংবিধান সংশোধনের বিষয়ে তাদের চুক্তির মূলনীতি অনুসরণ না করায় পিপলস পার্টি তার উপর চাপ সৃষ্টি করে এবং অনাস্থা ভোটের হুমকি দেয়।
এই পদক্ষেপটি প্রত্যাশিত সময়ের চেয়ে আগে নেওয়া হয়েছে এবং অনুটিন বলেছেন যে তিনি "মানুষের কাছে ক্ষমতা ফিরিয়ে দিতে" চান।
সংসদ ভেঙে দেওয়ার পেছনের বিস্তারিত কারণ
প্রধানমন্ত্রী অনুতিনের সংসদ ভেঙে দেওয়ার সিদ্ধান্তটি বেশ কয়েকটি অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ এবং প্রতিশ্রুতির কারণে ত্বরান্বিত হয়েছে:
পিপলস পার্টির সাথে চুক্তি এবং তার লঙ্ঘন
পিপলস পার্টির সমর্থন: অনুতিন তার সংখ্যালঘু সরকারকে সমর্থন পেতে সংসদে বৃহত্তম বিরোধী জোট পিপলস পার্টির সাথে একটি চুক্তি করেছিলেন। সেপ্টেম্বরের সংসদীয় ভোটে তাদের সমর্থন নিশ্চিত করতে এই চুক্তিটি গুরুত্বপূর্ণ ছিল।
চুক্তির শর্তাবলী: ওই চুক্তি অনুসারে, অনুতিনের শপথ গ্রহণের চার মাসের মধ্যে সংসদ ভেঙে দেওয়া, সংবিধান সংশোধনের জন্য গণভোট আয়োজন করা এবং সীমান্ত বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য পদক্ষেপ নেওয়া কথা ছিল।
চুক্তি লঙ্ঘনের অভিযোগ: অনুতিন ও তার ভূমজথাই পার্টি সংবিধান সংশোধনের বিষয়ে চুক্তির মূল নীতিগুলো অনুসরণ না করায় পিপলস পার্টি তার উপর চাপ সৃষ্টি করে।
অনাস্থা ভোটের আশঙ্কা
বিরোধীদের হুমকি: নিক্কেই এশিয়া (জাপানি সংবাদ সংস্থা) অনুসারে, শুক্রবার নতুন সংসদীয় অধিবেশন শুরু হওয়ার ঠিক আগে বিরোধী দল অনুতিনের সরকারের বিরুদ্ধে অনাস্থা প্রস্তাব উত্থাপনের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা করছিল।
সরকারের দুর্বলতা: অনুটিনের সরকার একটি সংখ্যালঘু সরকার হওয়ায়, অনাস্থা প্রস্তাবে হেরে যাওয়ার ঝুঁকি ছিল। এই ঝুঁকি এড়াতে, তিনি অনাস্থা ভোটের মুখোমুখি হওয়ার আগেই সংসদ ভেঙে দেন।
অভ্যন্তরীণ চ্যালেঞ্জ এবং অদক্ষতা
রাজনৈতিক অচলাবস্থা: রাজকীয় গেজেট (Royal Gazette)-এ অনুটিনের একটি প্রতিবেদন উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে, "যেহেতু প্রশাসন একটি সংখ্যালঘু সরকার এবং অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিস্থিতি বহুমুখী চ্যালেঞ্জে জর্জরিত, তাই সরকার রাষ্ট্রীয় বিষয়গুলো নিরবচ্ছিন্নভাবে, দক্ষতার সাথে এবং স্থিতিশীলতার সাথে পরিচালনা করতে পারছে না।"
প্রাকৃতিক দুর্যোগের অব্যবস্থাপনা: নভেম্বর মাসের শেষ থেকে দক্ষিণ থাইল্যান্ডের বন্যা পরিস্থিতি মোকাবেলায় সরকারের ভূমিকা নিয়ে অনুতিন এবং তার ভূমজথাই পার্টিকে তীব্র সমালোচনার মুখে পড়তে হয়েছিল। এই অব্যবস্থাপনাও সরকারের বিরুদ্ধে জনমতকে প্রভাবিত করেছে।
রাজকীয় গেজেটের অভিমত
রাজনৈতিক অচলাবস্থা এবং চ্যালেঞ্জের মুখে, রাজকীয় গেজেট উপসংহারে বলেছে: "অতএব, উপযুক্ত সমাধান হলো হাউস অফ রিপ্রেজেন্টেটিভস (সংসদ) ভেঙে দেওয়া এবং একটি নতুন সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত করা।"
সুতরাং, সংসদ ভেঙে দেওয়ার সিদ্ধান্তটি একইসাথে রাজনৈতিক অঙ্গীকার রক্ষা (আংশিকভাবে), অনাস্থা ভোট এড়ানো, এবং সরকারের দুর্বলতা স্বীকার করার একটি কৌশলগত পদক্ষেপ ছিল।