শিরোনাম
ডেস্ক রিপোর্ট
প্রকাশ: ১০:১১, ১ মার্চ ২০২৬
কাতারে ছোঁড়া ইরানের একটি মিসাইল। ছবি: সংগৃহীত।
আমেরিকা ও ইসরায়েলের যৌথ হামলার জবাবে ইরান মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে অবস্থিত মার্কিন লক্ষ্যবস্তুগুলোতে পাল্টাহামলা শুরু করেছে।
ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ডস (IRGC) দাবি করেছে যে তারা মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থিত সব মার্কিন ও ইসরায়েলি সামরিক ঘাঁটিতে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে। বিশেষ করে যেসব দেশ মার্কিন সামরিক সম্পদকে জায়গা দিয়েছে, তাদের ওপর আক্রমণ চালানো হয়েছে, খবর আল জাাজিরার।
সংযুক্ত আরব আমিরাত (UAE): রাজধানী আবুধাবিতে বেশ কিছু ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হেনেছে। এতে অন্তত একজন নিহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। এছাড়া দুবাইয়ের বিখ্যাত 'পাম জুমেইরাহ' এলাকায় একটি ভবনে বিস্ফোরণ ও অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে, যাতে ৪ জন আহত হয়েছেন।
বাহরাইন: মানামায় অবস্থিত মার্কিন নৌবাহিনীর ৫ম ফ্লিট (5th Fleet)-এর সদর দপ্তর লক্ষ্য করে ইরান ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে। বাহরাইন সরকার একে তাদের সার্বভৌমত্বের ওপর "বিশ্বাসঘাতকতামূলক হামলা" হিসেবে বর্ণনা করেছে।
কাতার ও কুয়েত: এসব দেশে অবস্থিত মার্কিন বিমানঘাঁটিগুলোতেও ইরান ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে। কাতারের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, তারা বেশ কিছু ক্ষেপণাস্ত্র আকাশেই ধ্বংস করতে সক্ষম হয়েছে।
ইরানের আনুষ্ঠানিক অবস্থান
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি জাতিসংঘে পাঠানো এক চিঠিতে জানিয়েছেন যে, যতক্ষণ পর্যন্ত এই আগ্রাসন পুরোপুরি বন্ধ না হবে, ততক্ষণ ইরান তার "আত্মরক্ষার অধিকার" প্রয়োগ জারি রাখবে।"শত্রু পুরোপুরি পরাজিত না হওয়া পর্যন্ত এই অভিযান নিরবচ্ছিন্নভাবে চলবে।" — আইআরজিসি (IRGC)
আঞ্চলিক সংকটের আশঙ্কা
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই পাল্টাহামলার মাধ্যমে ইরান প্রমাণ করতে চাইছে যে মধ্যপ্রাচ্যের মার্কিন মিত্র দেশগুলোও নিরাপদ নয়। হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দেওয়া বা লোহিত সাগরে হুথি বিদ্রোহীদের মাধ্যমে হামলা জোরদার করার হুমকিও দিয়ে রেখেছে ইরান, যা বিশ্ব অর্থনীতি ও জ্বালানি সরবরাহের জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
ইরানের প্রতিশোধমূলক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলায় বাহরাইন, কুয়েত, কাতার এবং সৌদি আরবের পরিস্থিতি বেশ নাজুক হয়ে পড়েছে।
বাহরাইন
আবাসিক এলাকায় ক্ষয়ক্ষতি: বাহরাইনের রাজধানী মানামায় মার্কিন নৌবাহিনীর ৫ম ফ্লিটের সদর দপ্তরের কাছে একটি আবাসিক টাওয়ারে ইরানের শাহেদ ড্রোন আছড়ে পড়েছে। এতে ভবনটিতে ভয়াবহ আগুন লেগে যায়।
সরকারি বক্তব্য: বাহরাইনের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, বেশ কিছু আবাসিক ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং সিভিল ডিফেন্স উদ্ধারকাজ চালাচ্ছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বাহরাইনের রাষ্ট্রদূত একে সার্বভৌমত্বের চরম লঙ্ঘন হিসেবে অভিহিত করেছেন।
কুয়েত
আলি আল-সালেম বিমানঘাঁটি: ইরানের বেশ কিছু ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কুয়েতের এই গুরুত্বপূর্ণ বিমানঘাঁটি লক্ষ্য করে ছোড়া হয়েছিল, তবে কুয়েতি প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সবগুলোই আকাশেই ধ্বংস করে দিয়েছে।
বিমানবন্দরে ড্রোন হামলা: কুয়েত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে একটি ড্রোন আঘাত হেনেছে। এতে বিমানবন্দরের যাত্রী টার্মিনালের ক্ষতি হয়েছে এবং কয়েকজন কর্মচারী সামান্য আহত হয়েছেন।
কাতার
আগাম সতর্কতা ব্যবস্থায় হামলা: কাতারের উত্তরাঞ্চলে একটি দূরপাল্লার আর্লি ওয়ার্নিং রাডারে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হেনেছে। কাতার জানিয়েছে, তারা তাদের পূর্বপরিকল্পিত নিরাপত্তা পরিকল্পনা অনুযায়ী অধিকাংশ হামলা প্রতিহত করেছে।
কূটনৈতিক অবস্থান: কাতার এই হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়ে বলেছে, তারা সব সময় আঞ্চলিক দ্বন্দ্ব থেকে নিজেদের দূরে রেখেছে, তাই তাদের ওপর এই হামলা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
সৌদি আরব
রিয়াদ ও পূর্বাঞ্চল লক্ষ্য করে হামলা: ইরান সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদ এবং দেশটির পূর্বাঞ্চল লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে। তবে সৌদি প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, তারা সফলভাবে এই হামলাগুলো প্রতিহত করেছে।
সৌদি আরবের হুঁশিয়ারি: সৌদি আরব স্পষ্ট করে জানিয়েছে যে, তারা তাদের আকাশসীমা বা ভূখণ্ড ইরানকে আক্রমণ করার জন্য ব্যবহার করতে দেয়নি, তবুও এই হামলা চালানো অযৌক্তিক।
সামগ্রিক পরিস্থিতি:
ইরানের এই পাল্টাহামলার ফলে পুরো মধ্যপ্রাচ্যের আকাশপথ কার্যত অচল হয়ে পড়েছে। দুবাই, আবুধাবি, দোহা এবং কুয়েতের মতো প্রধান বিমানবন্দরগুলোতে শত শত ফ্লাইট বাতিল করা হয়েছে, যার ফলে হাজার হাজার যাত্রী আটকা পড়েছেন।
ইরাক ও সিরিয়ার পরিস্থিতি
আরবিল বিমানবন্দর: উত্তর ইরাকের কুর্দিস্তানে অবস্থিত আরবিল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে শনিবার দুইবার হামলার চেষ্টা চালানো হয়েছে। ড্রোন হামলাগুলো আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার মাধ্যমে প্রতিহত করা হয়েছে। এখানে এখনও আইএসআইএস বিরোধী জোটের অংশ হিসেবে মার্কিন সেনা মোতায়েন রয়েছে।
কাতায়িব হিজবুল্লাহর ওপর হামলা: বাগদাদের দক্ষিণ-পশ্চিমে সশস্ত্র গোষ্ঠী কাতায়িব হিজবুল্লাহর সদর দপ্তরে ড্রোন হামলায় দুইজন নিহত হয়েছে। এছাড়া জুরফ আল-নাসর সামরিক ঘাঁটিতেও বিমান হামলার খবর পাওয়া গেছে।
হুঁশিয়ারি: কাতায়িব হিজবুল্লাহ এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, তারা খুব শীঘ্রই মার্কিন ঘাঁটিগুলোতে পাল্টা আক্রমণ শুরু করবে।
সিরিয়া: সিরিয়ার সুওয়ায়দা শিল্প এলাকায় একটি ক্ষেপণাস্ত্র বিস্ফোরণে চারজন নিহত এবং অনেকে আহত হয়েছেন। তবে এই ক্ষেপণাস্ত্রটি কোথা থেকে এসেছে তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
যোগাযোগ ও পরিবহন ব্যবস্থা
আকাশপথ বন্ধ: কাতার, কুয়েত, বাহরাইন এবং সংযুক্ত আরব আমিরাত সাময়িকভাবে তাদের আকাশপথ বন্ধ করে দিয়েছে এবং ইরানের হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়েছে।
হরমুজ প্রণালী: পারস্য উপসাগরে চলাচলকারী জাহাজগুলো হরমুজ প্রণালী বন্ধ হওয়ার বার্তা পেয়েছে। এটি বিশ্বের অন্যতম প্রধান তেল রপ্তানি পথ, যা সৌদি আরব, ইরান, ইরাক এবং আরব আমিরাতকে ওমান উপসাগরের সাথে যুক্ত করে। এই পথ বন্ধ হওয়ায় বিশ্ববাজারে জ্বালানি সংকটের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
ওমানের মধ্যস্থতা ও বর্তমান অবস্থা
জিসিসি (GCC) দেশগুলোর মধ্যে একমাত্র ওমান এখন পর্যন্ত ইরানের হামলার লক্ষ্যবস্তু হয়নি। ওমান দীর্ঘদিন ধরে ইরান ও পশ্চিমা বিশ্বের মধ্যে সেতুবন্ধন হিসেবে কাজ করে আসছে।
ব্যর্থ আলোচনা: ওমানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বদর আলবুসাইদি শুক্রবারই আশাবাদ ব্যক্ত করেছিলেন যে শান্তি চুক্তির খুব কাছাকাছি তারা পৌঁছেছেন। কিন্তু কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে ইসরায়েল ও আমেরিকার হামলার ফলে সেই শান্তি আলোচনা এখন পুরোপুরি ভেস্তে গেছে।
ওমানের আহ্বান: আলবুসাইদি এই সহিংসতায় গভীর হতাশা প্রকাশ করেছেন এবং ওয়াশিংটনকে এই যুদ্ধে আরও না জড়ানোর আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, "এটি আপনাদের যুদ্ধ নয়।"
দোহা থেকে বিশেষ রিপোর্ট
আল জাজিরার প্রতিনিধি জানিয়েছেন, গত কয়েক ঘণ্টায় কাতারের রাজধানী দোহায় অন্তত এক ডজন বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে। এর বেশিরভাগই ছিল ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ঠেকাতে ব্যবহৃত 'প্যাট্রিয়ট' ডিফেন্স সিস্টেমের শব্দ। বিশ্লেষকদের মতে, যেহেতু আমেরিকা ও ইসরায়েল প্রথম আক্রমণটি করেছে, তাই ইরান এখন পুরো অঞ্চলের যে কোনো মার্কিন বা ইসরায়েলি লক্ষ্যবস্তুকে বৈধ টার্গেট হিসেবে বিবেচনা করছে।