শিরোনাম
ম. মৃধা
প্রকাশ: ১১:২৯, ৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
প্রতিনিধিত্বশীল ছবি: সংগৃহীত।
বিশ্বজুড়ে যুদ্ধ, সাম্প্রদায়িক সহিংসতা, রাজনৈতিক অস্থিরতা ও পারিবারিক দ্বন্দ্ব ক্রমেই উদ্বেগজনক আকার ধারণ করছে। জাতিসংঘের সাম্প্রতিক তথ্যমতে, বর্তমানে বিশ্বের প্রায় ৬০টির বেশি অঞ্চলে সশস্ত্র বা সামাজিক সংঘাত সক্রিয় রয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে সংঘাত ব্যবস্থাপনা এখন কেবল কূটনৈতিক বা প্রশাসনিক বিষয় নয়, বরং একটি গভীর মানবিক ও নৈতিক প্রশ্ন। এমন বাস্তবতায় আড়াই হাজার বছর আগের গৌতম বুদ্ধের দর্শন নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছে।
সংঘাত কেন বাড়ছে
বিশেষজ্ঞদের মতে, আধুনিক সংঘাতের পেছনে রয়েছে ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ, অর্থনৈতিক বৈষম্য, ধর্মীয় উগ্রতা ও তথ্যপ্রযুক্তিজনিত বিভ্রান্তি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঘৃণা ও ভ্রান্ত তথ্য দ্রুত ছড়িয়ে পড়ায় সংঘাত আরও তীব্র হচ্ছে। সমাজবিজ্ঞানীরা বলছেন, বাহ্যিক কারণের চেয়েও মানুষের ভেতরের লোভ, ক্রোধ ও অহংকার সংঘাতকে দীর্ঘস্থায়ী করে তোলে—যা গৌতম বুদ্ধের দর্শনের সঙ্গে গভীরভাবে মিলে যায়।
বুদ্ধের দৃষ্টিতে সংঘাতের মূল
গৌতম বুদ্ধ মানুষের দুঃখ ও সংঘাতের মূল কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছিলেন তিনটি বিষ—তৃষ্ণা, দ্বেষ ও অবিদ্যা। তাঁর মতে, ব্যক্তি যখন নিজের আকাঙ্ক্ষা ও ক্রোধকে নিয়ন্ত্রণ করতে ব্যর্থ হয়, তখন সেই অস্থিরতা সমাজ ও রাষ্ট্রে ছড়িয়ে পড়ে। বুদ্ধের এই বিশ্লেষণ আধুনিক মনোবিজ্ঞান ও কনফ্লিক্ট স্টাডিজের সঙ্গে বিস্ময়কর সাযুজ্যপূর্ণ।
অহিংসা: কেবল নৈতিকতা নয়, কৌশল
বুদ্ধের অহিংসা দর্শনকে অনেকেই কেবল নৈতিক আদর্শ হিসেবে দেখলেও বাস্তবে এটি একটি কার্যকর সংঘাত ব্যবস্থাপনা কৌশল। অহিংসা মানে দুর্বলতা নয়—বরং এটি সংযম ও কৌশলের শক্তি। ইতিহাসবিদদের মতে, অহিংস প্রতিরোধ ও সংলাপভিত্তিক সমাধান দীর্ঘমেয়াদে সহিংসতার চেয়ে বেশি কার্যকর ও টেকসই।
করুণা ও মৈত্রী: শত্রুকে মানুষ হিসেবে দেখা
বুদ্ধের করুণা (করুণা) ও মৈত্রী (মৈত্রীভাব) দর্শন সংঘাতের প্রচলিত “আমরা বনাম তারা” ধারণাকে ভেঙে দেয়। এই দর্শনে প্রতিপক্ষ শত্রু নয়, বরং ভুলে পথ হারানো মানুষ। আন্তর্জাতিক শান্তি গবেষণায় দেখা গেছে, যেখানে সহমর্মিতা ও মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি প্রাধান্য পায়, সেখানে সংঘাত দ্রুত প্রশমিত হয়।
মধ্যপন্থা ও সংলাপের রাজনীতি
বুদ্ধের মধ্যমার্গ চরমপন্থার বিরুদ্ধে এক শক্ত অবস্থান। আধুনিক রাজনৈতিক ও সামাজিক সংঘাতে যেখানে একদিকে দমননীতি, অন্যদিকে প্রতিশোধের সংস্কৃতি দেখা যায়, সেখানে বুদ্ধের মধ্যপন্থা সংলাপ, আপস ও আত্মসমালোচনার পথ দেখায়। আজকের Alternative Dispute Resolution (ADR) বা শান্তিপূর্ণ বিরোধ নিষ্পত্তি পদ্ধতিতে এই দর্শনের স্পষ্ট প্রতিফলন দেখা যায়।
মাইন্ডফুলনেস ও আত্মনিয়ন্ত্রণ
বর্তমানে বিশ্বজুড়ে কর্পোরেট ম্যানেজমেন্ট, সামরিক প্রশিক্ষণ এমনকি কূটনৈতিক আলোচনাতেও মাইন্ডফুলনেস চর্চা জনপ্রিয় হচ্ছে। বুদ্ধ প্রবর্তিত এই সচেতনতা চর্চা মানুষের আবেগ নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করে, যা সংঘাতের মুহূর্তে ভুল সিদ্ধান্ত কমায়। গবেষকরা বলছেন, সচেতনতা বৃদ্ধি পেলে সহিংস প্রতিক্রিয়া উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পায়।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে প্রাসঙ্গিকতা
বাংলাদেশে পারিবারিক বিরোধ, রাজনৈতিক মেরুকরণ ও সামাজিক সহিংসতা বাড়ছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, শিক্ষা ও সামাজিক নীতিতে অহিংসা, সহনশীলতা ও সংলাপের সংস্কৃতি জোরদার না হলে সংঘাত আরও গভীর হবে। এই প্রেক্ষাপটে গৌতম বুদ্ধের দর্শন ধর্মীয় সীমানা ছাড়িয়ে একটি সর্বজনীন মানবিক নির্দেশনা হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
উপসংহার
সংঘাত কোনো ব্যতিক্রম নয়, এটি মানব সমাজের বাস্তবতা। প্রশ্ন হলো—আমরা সংঘাতকে ধ্বংসের পথে নিয়ে যাব, নাকি তা থেকে শান্তি ও সহাবস্থানের পথ তৈরি করব। গৌতম বুদ্ধ দেখিয়েছিলেন, সত্যিকারের বিজয় অন্যকে পরাজিত করার মধ্যে নয়, বরং নিজের লোভ, ক্রোধ ও অজ্ঞতাকে জয় করার মধ্যে। সহিংস ও বিভক্ত এই বিশ্বে তাঁর দর্শন আজও শান্তির এক অতি প্রাসঙ্গিক ও সর্বদা বাতিঘর-তুল্য।