শিরোনাম
বিবিসি নিউজ বাংলা
প্রকাশ: ০৯:৫৭, ৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | আপডেট: ০৯:৫৮, ৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
ছবি: সংগৃহীত।
কর্মজীবী নারীদের কর্মঘণ্টা তিন ঘণ্টা কমানোর যে বক্তব্য নিয়ে নানা রকম আলোচনা-সমালোচনা এর আগেও তৈরি হয়েছিল, সেই বিষয়টি ব্যাখ্যা করে নির্বাচনী ইশতেহারে রেখেছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। ক্ষমতায় গেলে দুর্নীতি ও চাঁদাবাজিমুক্ত একটি ইনসাফভিত্তিক রাষ্ট্র ব্যবস্থা গঠনেরও ঘোষণা দিয়েছে দলটি।
বুধবার সন্ধ্যায় ঢাকার একটি হোটেলে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ইশতেহার ঘোষণা করে জামায়াতে ইসলামী।
ইশতেহার ঘোষণার আগে দলটির আমির শফিকুর রহমান বলেন, "আমরা বেকারভাতা নয়, যুবকদের হাতে কাজ তুলে দেবো। চা শ্রমিকদের জন্য ইনসাফ করা হবে। একজন চা শ্রমিকের সন্তান যেন একদিন দেশের প্রধানমন্ত্রী হতে পারেন"।
সেই সাথে পার্বত্য অঞ্চলে শান্তি প্রতিষ্ঠা ও পাহাড়ি-বাঙালি দূরত্ব ও বৈষম্য দূর করতে বিভিন্ন পরিকল্পনার কথাও তুলে ধরেন দলটির আমির।
১০ট প্রতিশ্রুতির কথা জানিয়ে ইশতেহারে দলটি বলেছে, আগামীতে জামায়াতে ইসলামী ক্ষমতায় গেলে সততা, ঐক্য, ইনসাফ, দক্ষতা ও কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করবে। আর এর বিপরীতে দুর্নীতি, ফ্যাসিবাদ, আধিপত্যবাদ, বেকারত্ব ও চাঁদাবাজিমুক্ত বাংলাদেশ গঠন করবে।
ইশতেহারে জামায়াত জানিয়েছে, আগামীতে সরকার ক্ষমতায় গেলে রাষ্ট্র পরিচালনায় ২৬টি বিষয়ে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। ইশতেহারে আলাদা করে ৪১ দফা প্রতিশ্রুতির কথাও তুলে ধরেছে দলটি।
জামায়াতে আমির জানান, সারাদেশের কয়েক লাখ মানুষের মতামত, বিশেষজ্ঞ টিমসহ বিভিন্ন মাধ্যম থেকে পাওয়া পরামর্শের ভিত্তিতে এই ইশতেহার প্রস্তুত করেছে দলটি।
অগ্রাধিকারে ২৬টি দফা
বুধবার জামায়াতে ইসলামী ঘোষিত ইশতেহারে দেশের বিভিন্ন বিষয়ে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে ২৬টি বিষয় তুলে ধরা হয়েছে।
সেগুলো হচ্ছে- ১.'জাতীয় স্বার্থে আপসহীন বাংলাদেশ' এই স্লোগানের আলোকে স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় স্বার্থে আপসহীন রাষ্ট্র গঠন;
২. বৈষম্যহীন, ন্যায় ও ইনসাফভিত্তিক একটি মানবিক বাংলাদেশ গঠন;
৩. যুবকদের ক্ষমতায়ণ এবং রাষ্ট্র পরিচালনায় তাদেরকে প্রাধান্য দেওয়া;
৪. নারীদের জন্য নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও অংশগ্রহণমূলক রাষ্ট্র গঠন;
৫. আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির সার্বিক উন্নয়নের মাধ্যমে মাদক, চাঁদাবাজ ও সন্ত্রাসমুক্ত একটি নিরাপদ রাষ্ট্র বিনির্মাণ;
৬. সকল পর্যায়ে সৎ নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের মাধ্যমে দুর্নীতিমুক্ত রাষ্ট্র গঠন;
৭. প্রযুক্তিনির্ভর আধুনিক ও স্মার্ট সমাজ গঠন;
৮. প্রযুক্তি, ম্যানুফ্যাকচারিং, কৃষি ও শিল্পসহ নানা সেক্টরে ব্যাপকভিত্তিক কর্মসংস্থান সৃষ্টি সরকারি চাকরিতে বিনামূল্যে আবেদন, মেধার ভিত্তিতে নিয়োগ ও সকল ধরনের বৈষম্য দূরীকরণ;
৯. ব্যাংকসহ সার্বিক আর্থিক যাতে সংস্কারের মাধ্যমে আস্থা ফিরিয়ে এনে বিনিয়োগ ও ব্যবসা বান্ধব টেকসই ও স্বচ্ছ অর্থনীতি বিনির্মাণ;
১০. সমানুপাতিক (পিআর) পদ্ধতির নির্বাচনসহ সুষ্ঠু নির্বাচনী পরিবেশ তৈরি ও তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা শক্তিশালী করে সুসংহত ও কার্যকর গণতন্ত্র নিশ্চিত করা;
১১. বিগত সময়ে রাষ্ট্রীয় পৃষ্টপোষকতায় হওয়া খুন, গুম ও বিচারবর্হিভূত হত্যাকাণ্ডের বিচার ও মৌলিক মানবাধিকার নিশ্চিত করা;
১২. জুলাই বিপ্লবের ইতিহাস সংরক্ষণ, শহীদ পরিবার, আহত ও পঙ্গুত্ববরণকারী জুলাই যোদ্ধাদের পুনর্বাসন এবং জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করা;
১৩. কৃষিতে প্রযুক্তির ব্যবহার ও কৃষকদের সহযোগিতা বাড়ানোর মাধ্যমে কৃষিতে বিপ্লব সৃষ্টি করা;
১৪. ২০৩০ সালের মধ্যে সম্পূর্ণ ভেজালমুক্ত খাদ্য নিরাপত্তা এবং 'তিন শূন্য ভিশন (পরিবেশগত শূন্যতা, বর্জ্যের শূন্যতা এবং বন্যা-ঝুঁকির শূন্যতা), বাস্তবায়নের মাধ্যমে 'সবুজ ও বাংলাদেশ গড়া;
১৫. ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের বিকাশের পাশাপাশি ভারী শিল্প প্রতিষ্ঠা, দেশি-বিদেশি বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিতের মাধ্যমে ব্যাপকভিত্তিতে শিল্পায়ন ও কর্মসংস্থান তৈরি;
১৬. শ্রমিকদের মজুরি ও জীবনযাত্রার মান বৃদ্ধি এবং মানসম্মত কাজের পরিবেশ; বিশেষ করে নারীদের নিরাপদ কাজের পরিবেশ, সৃষ্টি করা;
১৭. প্রবাসীদের ভোটাধিকারসহ সকল অধিকার নিশ্চিতকরণ এবং দেশ গঠনে আনুপাতিক ও বাস্তবসম্মত অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা;
১৮. সংখ্যাগুরু-সংখ্যালঘু (মেজরিটি-মাইনরিটি) নয়, বরং বাংলাদেশের নাগরিক হিসেবে সকলের নাগরিক অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং পিছিয়ে থাকা নাগরিক ও শ্রেণি-গোষ্ঠীর জন্য বিশেষ সুবিধা নিশ্চিত করা;
১৯. আধুনিক ও সার্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা প্রদান এবং গরিব ও অসহায় জনগোষ্ঠীর জন্য পর্যায়ক্রমে বিনামূল্যে উন্নত চিকিৎসা নিশ্চিত করা;
২০. সমসাময়িক বিশ্বের চাহিদাকে সামনে রেখে শিক্ষাব্যবস্থার মৌলিক সংস্কার এবং পর্যায়ক্রমে বিনামূল্যে শিক্ষা নিশ্চিত করা;
২১. দ্রব্যমূল্য ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে বেধে স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা এবং অন্যান্য মৌলিক চাহিদার পূর্ণ সংস্থানের নিশ্চয়তা;
২২. যাতায়াত ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজানো এবং রাজধানীর সাথে দেশের বিভাগীয় শহরগুলোর সড়ক/রেলপথের দূরত্ব পর্যায়ক্রমে দুই-তিন ঘণ্টায় নামিয়ে আনা। দেশের আঞ্চলিক যোগাযোগ ও চাকার অভ্যন্তরীণ যাতায়াতব্যবস্থায় মৌলিক পরিবর্তন আনা;
২৩. নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের জন্য স্বল্পমূল্যে আবাসন নিশ্চিত করা;
২৪. ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থার পূর্ণ বিলোপে চলমান বিচার ও সংস্কার কার্যক্রমকে অব্যাহত রেখে বাংলাদেশে ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থার পুনর্জন্ম রোধ করা;
২৫. সর্বজনীন সামাজিক নিরাপত্তাব্যবস্থা চালু করার মাধ্যমে নিরাপদ কর্মজীবন ও পর্যায়ক্রমে সকল নাগরিকদের আন্তর্জাতিক মানের সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা;
২৬. সকল পর্যায়ে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার মাধ্যমে সুশাসন নিশ্চিত করে একটি সুখী ও সমৃদ্ধ কল্যাণ-রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা।
জামায়াত আমির মি. রহমান বলেন, "আমাদের ইশতেহার হলো জনবান্ধব, ব্যবসা বান্ধব, শান্তি বান্ধব ও শৃঙ্খলা বান্ধব। আমরা বেসরকারি ব্যবসাকে বেশি উৎসাহিত করতে চাই। যেখানে শিল্প মালিকরা হবেন দেশের আইকন। তাদের আমরা শিশুর মতো যত্ন নেবো"।
নারীর কর্মঘণ্টা, নিরাপত্তা- শ্রম ও কর্মসংস্থান
ইশতেহার ঘোষণার আগে ও পরে আগামীর বাংলাদেশ পরিচালনায় দলটির অঙ্গীকার তুলে ধরে দুটি ভিডিও উপস্থাপনা দেওয়া হয়। এতে নির্বাচনে জয়ী হলে দলটির লক্ষ্য, উদ্দেশ্য ও অঙ্গীকারসহ বিভিন্ন পদক্ষেপের কথা তুলে ধরা হয়।
জামায়াতে ইসলামী তাদের ইশতেহারে তৃতীয়ভাগে বেকারত্ব দূর করতে কর্মসংস্থান নিয়ে বিশেষ পরিকল্পনার কথাও তুলে ধরে।
যেখানে বলা হয়- বেকারত্ব দূর করতে সাত কোটি কর্মক্ষম যুবকের জন্য দুই ভাগে কর্মসংস্থান তৈরি করা হবে। এবং সেটি দেশে ও দেশের বাইরে দুই জায়গাতেই করা হবে।
যথাযথ প্রশিক্ষণের মাধ্যমে নতুন নতুন কর্মসংস্থান তৈরির জন্য পলিসি প্রস্তুত করার কথাও বলেছে দলটি। এজন্য যথাযথ প্রশিক্ষণের কথাও ইশতেহারে তুলে ধরা হয়েছে।
বিদেশে যেতে আগ্রহী বেকার জনশক্তিদের কারিগরি প্রশিক্ষণ, কম খরচে বিদেশে যাওয়ার জন্য আন্তঃসরকার চুক্তি, বিদেশ যাত্রায় ঋণ প্রদান ও ৫০ লাখ যুবকদের বিদেশে কর্মসংস্থানেরও পরিকল্পনা রয়েছে জামায়াতের।
জামায়াত তাদের ইশতেহারে বলেছে দলটি ক্ষমতায় আসলে নারীদের সম্মান রক্ষা করে নিরাপদ কাজের পরিবেশ নিশ্চিত করা হবে। সেই সাথে মাতৃত্বকালীন সময়ে মায়েদের সম্মতি সাপেক্ষে কর্মঘণ্টা পাঁচ এ নামিয়ে আনা হবে তাদের সম্মতি সাপেক্ষে।
এ সময়ে জামায়াতে আমির শফিকুর রহমান বলেন, "নারীদের যেন চাকরি না ছাড়তে হয় সেজন্য মায়েদের কর্মঘণ্টা কমানোর কথা বলেছি। অথচ এটা নিয়ে নানা কথা ছড়ানো হলো। আমরা নাকি নারীদের চাকরি করতে দিতে চাই না। আমরা চাই অনেক নারী মা হওয়ার পর চাকরি ছেড়ে দেন, তাদের যেন চাকরি না ছাড়তে হয়, সেজন্য কর্মঘণ্টা শিথিল করার কথা বলেছি"।
ইশতেহারে দলটি বলেছে, সরকারি চাকরির আবেদনের জন্য যে ফি নেওয়ার রীতি আছে দলটি ক্ষমতায় এলে এই নিয়ম বাতিল করা হবে।
এছাড়া ব্যবসায়ী সমাজের সাথে আলোচনার ভিত্তিতে শ্রমিকদের নূন্যতম মজুরি পুনর্নির্ধারণের অঙ্গীকারও করেছে দলটি।
শিক্ষা ও স্বাস্থ্য সেবা নিয়ে যা বলা হয়েছে
জামায়াতের ইশতেহারে শিক্ষা ব্যবস্থা ঢেলে সাজাতে বেশ কিছু পরিকল্পনার কথা তুলে ধরা হয়েছে। যেখানে বলা হয়েছে দলটি ক্ষমতায় গেলে শিক্ষাবিদ ও গবেষকদের সমন্বয়ে স্থায়ী শিক্ষা কমিশন গঠন করা হবে। শিক্ষা বাজেট বাড়িয়ে জিডিপির ছয় শতাংশ করার কথাও তুলে ধরা হয়েছে ইশতেহারে।
আর্থিকভাবে অসচ্ছল কোনো শিক্ষার্থী বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ পেলে বিনা সুদে প্রথম দুই সেমিস্টার ফি সরকার প্রদান করবে। আর দেশের ভেতর দরিদ্র শিক্ষার্থীদের মাসে তিন হাজার টাকা করে প্রদান করা হবে।
স্নাতক পর্যায়ে বিশ্ববিদ্যালয় ও মাদ্রাসার এক লাখ মেধাবী শিক্ষার্থীকে প্রতি মাসে সর্বোচ্চ ১০ হাজার টাকা করে সর্বোচ্চ পাঁচ বছরের সুদমুক্ত ঋণ দেওয়ারও ঘোষণা রয়েছে ইশতেহারে।
স্কুল কলেজে শিক্ষক নিয়োগের জন্য পৃথক নিয়োগ পদ্ধতি ও বেতন কাঠামো প্রচলন করা হবে। এছাড়া সকল শিক্ষকদের পর্যায়ক্রমে উচ্চ গ্রেডে অন্তর্ভুক্ত করা হবে।
মাদ্রাসা শিক্ষা ব্যবস্থায় বৈষম্য দূর করার পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেছে দলটি। এই ইশতেহারে ঘোষণা করা হয়েছে জামায়াতে ইসলামী সরকার গঠন করলে ইবেতদায়ি মাদ্রাসাগুলো প্রাইমারি স্কুলের মতো সরকারি করা হবে। পরিমার্জন করা হবে কওমি শিক্ষা সিলেবাস।
নারী শিক্ষার উন্নয়নে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে দলটি। এতে বলা হয়েছে- জামায়াত ক্ষমতায় গেলে স্নাতক পর্যন্ত নারীরা বিনা বেতনে পড়াশোনা করতে পারবে।
শিক্ষা ক্ষেত্রে দুর্নীতি বন্ধ, শিক্ষায় সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করা, শিক্ষাক্রমের আধুনিকায়নসহ বেশ কিছু পরিকল্পনার কথা রয়েছে ইশতেহারে।
জামায়াতের ইশতেহারে সবচেয়ে বেশি প্রাধান্য পেয়েছে স্বাস্থ্য সেবার বিষয়টি। একদিকে যেমন কম খরচে উন্নত চিকিৎসা নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে, অন্যদিকে পাঁচ বছরের নিচে ও ৬০ বছরের ওপরে সবাইকে বিনামূল্যে স্বাস্থ্য সেবা নিশ্চিত করার ঘোষণাও দিয়েছে দলটি।
এছাড়া পর্যায়ক্রমে স্বাস্থ্যখাতের বাজেট তিনগুন বাড়ানোর কথা বলা হয়েছে। সকল জেলায় পর্যায়ক্রমে পূর্ণাঙ্গ হাসপাতাল স্থাপন করার কথা উল্লেখ আছে ইশতেহারে।
জামায়াতের আমির শফিকুর রহমান বলেন, "কোনো জেলা যাতে বাদ না থাকে, ৬৪টি জেলায়ই মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠা করবে জামায়াত"।