শিরোনাম
ডেস্ক রিপোর্ট
প্রকাশ: ২০:৫৮, ১৮ মার্চ ২০২৬
প্রতীকি ছবি: সংগৃহীত।
মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা বৃদ্ধি এবং হরমুজ প্রণালীতে কার্যত যান চলাচল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় তেলের দাম বাড়ছে। ফিচ রেটিংসের প্রধান অর্থনীতিবিদের মতে, এই দাম যদি এক বছর ধরে ১০০ ডলারের স্তরে থাকে, তবে বিশ্ব অর্থনীতিতে ৫০০ বিলিয়ন ডলারের একটি ধাক্কা বা শক তৈরি হতে পারে।
২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের শুরু করা হামলা এবং ইরানের পাল্টা জবাবের ধারাবাহিকতা তৃতীয় সপ্তাহে পদার্পণ করায়, এই দেশগুলোর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বাণিজ্যিক জাহাজগুলোর জন্য হরমুজ প্রণালী কার্যত বন্ধ রয়েছে, খবর ডেইরী সাবাহ’র।
এই কৌশলগত পথ দিয়ে প্রতিদিন প্রায় ২০ মিলিয়ন ব্যারেল বা বিশ্বব্যাপী তেলের চাহিদার ২০ শতাংশ পরিবহন করা হয়। এই পথে অপরিশোধিত তেল ও পেট্রোলিয়াম পণ্যের বাণিজ্য স্থবির হয়ে পড়ায় তেলের বাজারে সরবরাহ উদ্বেগ গভীর হয়েছে এবং দাম দ্রুত বৃদ্ধি পেয়েছে।
আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা (আইইএ) পূর্বাভাস দিয়েছে যে, চলতি মাস থেকে উপসাগরীয় অঞ্চলে সরবরাহ কমে যাওয়ার কারণে প্রতিদিন প্রায় ১০ মিলিয়ন ব্যারেল তেল বাজার থেকে ছিটকে যাবে। সংস্থাটি জানিয়েছে, এটি বিশ্ব তেলের বাজারের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় সরবরাহ বিপর্যয়।
হামলা শুরু হওয়ার আগের শেষ কার্যদিবস ২৭ ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মানদণ্ড হিসেবে পরিচিত ব্রেন্ট ক্রুড ফিউচারের দাম ছিল ৭৩.০১ ডলার। তবে হামলার এই সময়ে তা ১১৪.৩ ডলারে উঠে যায়, যা ২৯ জুন ২০২২-এর পর সর্বোচ্চ।
বর্তমানে ব্রেন্ট ক্রুড আঞ্চলিক খবরের ওপর ভিত্তি করে ওঠানামা করছে এবং প্রতি ব্যারেল প্রায় ১০০ ডলারে লেনদেন হচ্ছে। তেলের বাজারে এই সরবরাহ সীমাবদ্ধতা বিশ্বব্যাপী সরবরাহ শৃঙ্খলে বিঘ্ন ঘটাচ্ছে, আর দামের তীব্র বৃদ্ধি মুদ্রাস্ফীতির চাপ বাড়িয়ে অর্থনীতিকে হুমকির মুখে ফেলছে।
প্রণালী পুনরায় খুলে দিলে দাম কমতে পারে
আন্তর্জাতিক ঋণমান সংস্থা ফিচ রেটিংসের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, তেলের দামের এই বৃদ্ধি যদি দীর্ঘস্থায়ী না হয়, তবে এ বছর বিশ্বব্যাপী ২.৬ শতাংশ স্থিতিশীল অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি প্রত্যাশা করা যায়।
তবে তেলের দাম ১০০ ডলারে থাকার "প্রতিকূল পরিস্থিতিতে" বিশ্বব্যাপী বড় ধরণের সরবরাহ বিপর্যয়ের উচ্চ ঝুঁকি রয়েছে।
ফিচ রেটিংসের প্রধান অর্থনীতিবিদ ব্রায়ান কোল্টন আনাদোলু এজেন্সিকে দেওয়া এক মূল্যায়নে জানান, তেলের দাম বৃদ্ধি এবং সরবরাহের সীমাবদ্ধতা যদি দীর্ঘ সময় ধরে চলতে থাকে, তবে মুদ্রাস্ফীতি মারাত্মকভাবে বাড়তে পারে এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে লক্ষণীয় মন্দা দেখা দিতে পারে।
কোল্টন আরও জানান, মূল পরিস্থিতি অনুযায়ী তেলের দামের এই বৃদ্ধি "তুলনামূলকভাবে স্বল্পস্থায়ী"। তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, "যদি তেলের দাম এক বছর ধরে ১০০ ডলারে স্থির থাকে, তবে চার প্রান্তিক পরে বিশ্বব্যাপী মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) আধা শতাংশ কমে যেতে পারে। এর অর্থ হবে ৫০০ বিলিয়ন ডলারের একটি বিশাল ধাক্কা।"
কোল্টন উল্লেখ করেন যে, আপাতত তিনি বিশ্বাস করেন মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের প্রভাব বিশ্ব অর্থনীতির ওপর "সম্ভবত সাময়িক"। তিনি যোগ করেন যে, সংঘাতের আগে তেলের বাজারে সরবরাহের উদ্বৃত্ত ছিল এবং হরমুজ প্রণালী পুনরায় খুলে গেলে দাম খুব দ্রুত কমে আসতে পারে।
অন্যদিকে তিনি উল্লেখ করেন যে, জ্বালানির পাশাপাশি উপসাগরীয় অঞ্চল খাদ্য, রাসায়নিক এবং অন্যান্য উৎপাদন শিল্পের অনেক উপকরণেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ সরবরাহকারী। ফলে অন্যান্য পণ্যের দামেও বৃদ্ধি লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
উপসাগরীয় অঞ্চলের রপ্তানি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে
আইএনজি থিংক-এর সর্বশেষ বিশ্লেষণ অনুযায়ী, জ্বালানি বাজারকে প্রতিনিয়ত এই আশঙ্কার কথা মাথায় রেখে দাম নির্ধারণ করতে হচ্ছে যে, হরমুজ প্রণালী দিয়ে তেল ও গ্যাস প্রবাহের এই বিঘ্ন দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে।
উত্তেজনা প্রশমিত হওয়ার বা এই গুরুত্বপূর্ণ পথ দিয়ে তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) প্রবাহ পুনরায় শুরু হওয়ার খুব কম লক্ষণই দেখা যাচ্ছে।
চ্যাথাম হাউসের মিডল ইস্ট অ্যান্ড নর্থ আফ্রিকা প্রোগ্রামের বিশ্লেষক ডেভিড বাটারের একটি বিশ্লেষণ অনুযায়ী, উপসাগরীয় উৎপাদক দেশগুলো—যাদের অর্থনীতি মূলত তেল ও গ্যাস রাজস্বের ওপর নির্ভরশীল—তারা আয় হারানোর কারণে চড়া মূল্য দিচ্ছে। অন্যদিকে ওই অঞ্চলের আমদানিকারক দেশগুলোও জ্বালানি খরচ বৃদ্ধি এবং বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের ক্ষতির কারণে চাপের মুখে পড়ছে।
ধারণা করা হচ্ছে, নিজস্ব এলএনজি স্থাপনায় হামলার পর উৎপাদন বন্ধ রাখা কাতার এক মাসের রপ্তানি বিঘ্নিত হওয়ার কারণে অন্তত ৪ বিলিয়ন ডলারের আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হবে।
ইরাকের ক্ষেত্রে, যেটি উপসাগরীয় অঞ্চলের মধ্যে তেলের ওপর সবচেয়ে বেশি নির্ভরশীল অর্থনীতি, তাদের বাজেট রাজস্বের প্রায় ৯০ শতাংশই আসে অপরিশোধিত তেল রপ্তানি থেকে। এই তেলের একটি বিশাল অংশ বসরা অয়েল টার্মিনাল থেকে পারস্য উপসাগর এবং হরমুজ প্রণালী হয়ে পরিবাহিত হয়।
আশঙ্কা করা হচ্ছে যে, এই আয়ের দীর্ঘস্থায়ী ক্ষতি হলে সরকারি খাতের বেতন এবং পেনশন প্রদান করা কঠিন হয়ে পড়বে, যা তাদের বাজেট ব্যয়ের অর্ধেকেরও বেশি।