শিরোনাম
ডেস্ক রিপোর্ট
প্রকাশ: ১৫:৩৫, ১৮ মার্চ ২০২৬
ছবি: কাঠমান্ডু পোস্টের সৌজন্যে।
বাঘের রাজা রয়্যাল বেঙ্গল টাইগার এখন পাহাড়ি জনপদে। সম্প্রতি নেপালের তরাই অঞ্চলের সমতল ভূমি ছেড়ে এই বাঘের আনাগোনা দেখা গেছে মধ্য-পাহাড়ের জেলা পাল্পা এবং অর্ঘাখাঁচিতে। ক্যামেরা ট্র্যাপের মাধ্যমে অন্তত তিনটি পূর্ণবয়স্ক বাঘের উপস্থিতি নিশ্চিত করা হয়েছে, যা বন্যপ্রাণী সংরক্ষণে এক ঐতিহাসিক ঘটনা।
প্রথাগতভাবে বেঙ্গল টাইগাররা তরাইয়ের নিচু জমিতে বাস করলেও, ত্রিভুবন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের এক গবেষণায় দেখা গেছে যে তারা এখন ১,১০০ মিটারের বেশি উচ্চতায় বিচরণ করছে, খবর কাঠমান্ডু পোস্টের। লুম্বিনী প্রদেশের বন্যপ্রাণী পরিস্থিতি পর্যালোচনার সময় এই তথ্য সামনে আসে।
গবেষণার প্রধান হরি প্রসাদ শর্মা জানান, পাল্পার মাথগধি গ্রামীণ পৌরসভার মাথগধি দুর্গের কাছে ১,১১০ মিটার উচ্চতায় একটি বাঘ দেখা গেছে। এছাড়া তিনাউ গ্রামীণ পৌরসভার ঝুমসা খোলার ওপরের এলাকায় ৫৩৬ মিটার উচ্চতায় আরেকটি বাঘের ছবি ধরা পড়েছে। অন্যদিকে, অর্ঘাখাঁচি জেলার শীতগঙ্গা পৌরসভার রাজিয়া এলাকায় ৯৩৪ মিটার উচ্চতায় তৃতীয় বাঘটির দেখা মেলে। বিশেষ ভয়ের বিষয় হলো, এই বাঘটি স্থানীয় গ্রামবাসীদের যাতায়াতের পথে দেখা গেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, তরাই অঞ্চলের সংরক্ষিত এলাকাগুলোর ধারণক্ষমতা পূর্ণ হয়ে যাওয়ায় বাঘগুলো নতুন বাসস্থানের খোঁজে পাহাড়ে উঠছে। এটি একদিকে যেমন পরিবেশের সুস্থতার লক্ষণ, অন্যদিকে মানুষ ও বন্যপ্রাণীর সংঘাত বাড়ার আশঙ্কাও তৈরি করছে।
চুরে পর্বতমালা ও কমিউনিটি বন এলাকায় মোট ৯৪টি ক্যামেরা ট্র্যাপ বসিয়ে ২১ দিন ধরে এই গবেষণা চালানো হয়। বর্তমানে বাঘের শরীরের ডোরাকাটা দাগ বিশ্লেষণ করা হচ্ছে এটি নিশ্চিত হতে যে, এগুলো তিনটি আলাদা বাঘ নাকি একই বাঘ বারবার ক্যামেরায় ধরা দিয়েছে।
গবেষণায় আরও দেখা গেছে যে, এই অঞ্চলে অন্যান্য শিকারি প্রাণীর ঘনত্বও বেশ বেশি। পাল্পা ও অর্ঘাখাঁচি জেলাজুড়ে প্রায় ৪০টি চিতাবাঘের উপস্থিতি রেকর্ড করা হয়েছে। এমনকি শীতগঙ্গা এলাকায় একই ক্যামেরায় বাঘ এবং চিতাবাঘ—উভয়কেই দেখা গেছে, যা চুরে পর্বতমালায় প্রাণীদের মধ্যে সম্পদের তীব্র প্রতিযোগিতার ইঙ্গিত দেয়।
পাহাড়ি এলাকার বাসিন্দাদের মধ্যে এই খবর যেমন গর্বের, তেমনি কিছুটা উদ্বেগেরও। মাথগধি গ্রামীণ পৌরসভার প্রাক্তন চেয়ারম্যান সন্তোষ থাপা জানান, আগে বাঘের উপস্থিতির কথা শোনা গেলেও এবারই প্রথম বৈজ্ঞানিক প্রমাণ পাওয়া গেল। তিনি বলেন, "আগে আমরা শুধু 'পাতে বাঘ' (নেপালি ভাষায় বেঙ্গল টাইগার)-এর গল্প শুনতাম। এখন যেহেতু এটি প্রমাণিত, তাই স্থানীয় সরকারের উচিত সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেওয়া। আশার কথা হলো, প্রতিবেশী গোঠাদি এলাকায় চিতাবাঘের উপদ্রব থাকলেও বাঘের কারণে এখনও গবাদি পশু বা মানুষের কোনো ক্ষতি হয়নি।"
গবেষকদের জন্য চুরে ও মধ্য-পাহাড়ি অঞ্চল এবারই প্রথম চমক দিল তা নয়। ২০১৮ সালে রুপানদেহি-কপিলবস্তু-পাল্পা সীমান্তে প্রথম বাঘের উপস্থিতির প্রমাণ মেলে। এরপর ২০২৪ সালে কপিলবস্তুর বুদ্ধভূমি ও বিজয়নগরেও বাঘ দেখা গেছে। নিসদি সাব-ডিভিশন বন অফিসের প্রধান নন্দপ্রসাদ অধিকারী জানান, গত বছর পাল্পার জ্যামিরে এলাকাতেও একটি বাঘ দেখা গিয়েছিল। এই ধারাবাহিক তথ্যগুলো বাঘের উত্তর দিকে অভিবাসনের স্পষ্ট সংকেত দিচ্ছে।
বাঘের সংখ্যা বৃদ্ধি পরিবেশবিদদের আনন্দ দিলেও, তারা সাবধানতা অবলম্বনের পরামর্শ দিয়েছেন। বন ও পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র ফরেস্ট অফিসার তোলক রাজ চাপাগাঁই বলেন, "বাঘ যখন অসংরক্ষিত এলাকায় চলে আসে, তখন মানুষের সঙ্গে সংঘাতের ঝুঁকি বাড়ে। তাই জনসচেতনতা ও সঠিক বাসস্থান ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে এই সমস্যার সমাধান করতে হবে।"
ডব্লিউডব্লিউএফ (WWF) নেপালের প্রতিনিধি ঘনশ্যাম গুরুং মনে করেন, এই তথ্যগুলো ভবিষ্যতে বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ নীতি নির্ধারণে বড় ভূমিকা রাখবে। এটি বাঘের করিডোর চিহ্নিত করতে এবং চোরাচালান বন্ধে টহল জোরদার করতে সাহায্য করবে।
উল্লেখ্য যে, ২০০৯ সালে নেপালে বাঘের সংখ্যা ছিল মাত্র ১২১টি। ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পেয়ে ২০১৩ সালে ১৯৮, ২০১৮ সালে ২৩৫ এবং ২০২২ সালে সেই সংখ্যা ৩৫৫-তে পৌঁছেছে। বর্তমানে চিতওয়ান জাতীয় উদ্যানে সবচেয়ে বেশি ১২৮টি বাঘ রয়েছে, যার পরেই রয়েছে বারদিয়া (১২৫), পারসা (৪১), শুক্লাফান্তা (৩৬) এবং বাঁকে (২৫)।