শিরোনাম
ডেস্ক রিপোর্ট
প্রকাশ: ১০:৪০, ৬ মার্চ ২০২৬
প্রতীকি ছবি: সংগৃহীত।
ইউরোপীয় ইউনিয়ন তাদের ‘ইউরোপিয়ান গ্রিন ডিল’-এর অংশ হিসেবে ২০৩০ সালের মধ্যে ৩০০ কোটি অতিরিক্ত গাছ লাগানোর লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। এই বিশাল উদ্যোগের উদ্দেশ্য হলো জীববৈচিত্র্য রক্ষা করা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলা করা।
তবে লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় বর্তমান অগ্রগতির গতি বেশ ধীর। ইউরোপীয় পরিবেশ সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত রোপণ করা গাছের সংখ্যা লক্ষ্যের মাত্র একটি ছোট অংশ পূরণ করতে পেরেছে, রিপোর্ট ইউরো নিউজের।
চ্যালেঞ্জ ও প্রতিকূলতা
শুধুমাত্র নতুন গাছ লাগানোই যথেষ্ট নয়, কারণ বিদ্যমান বনগুলো এখন বড় ধরনের হুমকির মুখে।
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব: আপনার উল্লেখ করা গবেষণার মতোই, দাবানল, ঝড় এবং পোকার আক্রমণ (যেমন বার্ক বিটল) ইউরোপের বনাঞ্চলকে ধ্বংস করছে। ২০২৫ সালে পর্তুগাল ও স্পেনের ভয়াবহ দাবানল এর বড় উদাহরণ।
কার্বন সিঙ্ক হ্রাস: নতুন লাগানো চারাগাছ একটি পূর্ণবয়স্ক গাছের মতো কার্বন শোষণ করতে পারে না। পুরোনো বনগুলো যেভাবে কার্বন জমা রাখতে পারে, নতুন বন সেই পর্যায়ে পৌঁছাতে কয়েক দশক সময় নেয়।
আঞ্চলিক বৈষম্য: দক্ষিণ এবং পশ্চিম ইউরোপে বনের ক্ষতি সবচেয়ে বেশি হচ্ছে, যেখানে নতুন গাছ লাগিয়ে সেই শূন্যতা পূরণ করা কঠিন হয়ে পড়ছে।
বনায়ন কৌশলে পরিবর্তন
বিশেষজ্ঞরা এখন মনে করছেন যে কেবল গাছের সংখ্যা বাড়ানোই সমাধান নয়, বরং বনের ‘স্থিতিস্থাপকতা’ বা টিকে থাকার ক্ষমতা বাড়ানো জরুরি।
প্রাকৃতিক পুনর্জন্ম: অনেক ক্ষেত্রে কৃত্রিমভাবে চারা লাগানোর চেয়ে বনকে নিজে থেকে বড় হতে দেওয়া (Natural Regeneration) বেশি কার্যকর।
বৈচিত্র্যময় বন: একই প্রজাতির গাছ (Monoculture) না লাগিয়ে বিভিন্ন প্রজাতির গাছ লাগানো হচ্ছে যাতে রোগবালাই বা পোকার আক্রমণে পুরো বন উজাড় না হয়ে যায়।
ব্যবস্থাপনা: ক্রিস্টোফার রেয়ারের মতো বিজ্ঞানীরা বলছেন, বন ব্যবস্থাপনায় এখন এমন প্রজাতির গাছ বেছে নিতে হবে যা শুষ্ক ও গরম আবহাওয়া সহ্য করতে পারে।
ইউরোপীয় ইউনিয়ন গাছ লাগানোর চেষ্টা করছে ঠিকই, কিন্তু যে হারে বন ধ্বংস হচ্ছে এবং জলবায়ু পরিবর্তন তীব্র হচ্ছে, সেই তুলনায় এই উদ্যোগ এখনো যথেষ্ট নয়। বন রক্ষা এবং নতুন বনায়ন—উভয় ক্ষেত্রেই আরও দ্রুত এবং কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের '৩০০ কোটি গাছ' উদ্যোগের বর্তমান অবস্থা বেশ উদ্বেগজনক। মাত্র ১.২৬ শতাংশ লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হওয়া এটাই প্রমাণ করে যে, কাগজে-কলমে নেওয়া বড় পরিকল্পনাগুলো বাস্তবে বাস্তবায়ন করা কতটা কঠিন।
এই পরিস্থিতির একটি গভীর বিশ্লেষণ নিচে দেওয়া হলো:
বর্তমান সংকটের মূল কারণসমূহ
ইউরোপীয় কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, এই উদ্যোগটি আশানুরূপ গতি না পাওয়ার পেছনে বেশ কিছু সুনির্দিষ্ট কারণ রয়েছে:
স্বেচ্ছাসেবী বনাম বাধ্যতামূলক: কমিশন নিজেই স্বীকার করেছে যে এটি কোনো বাধ্যতামূলক আইন নয়, বরং একটি 'স্বেচ্ছাসেবী প্রতিশ্রুতি'। ফলে সদস্য দেশগুলো বা বেসরকারি সংস্থাগুলো এটি বাস্তবায়নে আইনগতভাবে বাধ্য নয়।
রিপোর্টিং সমস্যা: অনেক ক্ষেত্রে গাছ লাগানো হলেও সেগুলো কেন্দ্রীয় অনলাইন টুলে রিপোর্ট করা হচ্ছে না। ফলে প্রকৃত সংখ্যা এবং নথিবদ্ধ সংখ্যার মধ্যে বড় পার্থক্য থাকতে পারে।
জমির প্রাপ্যতা ও মালিকানা: ইউরোপের বিশাল অংশ ব্যক্তিগত মালিকানাধীন বা কৃষিকাজের জন্য ব্যবহৃত হয়। বনায়নের জন্য পর্যাপ্ত জমি খুঁজে পাওয়া এবং মালিকদের রাজি করানো একটি বড় চ্যালেঞ্জ।
তীব্র জলবায়ু পরিবর্তন: নতুন চারা রোপণ করার পর সেগুলো টিকে থাকার জন্য যে অনুকূল আবহাওয়া প্রয়োজন, খরা এবং অতিরিক্ত গরমের কারণে তা ব্যাহত হচ্ছে।
২০৩০ সালের লক্ষ্যমাত্রা কি অর্জনযোগ্য?
হিসাব অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে ৩০০ কোটি গাছের লক্ষ্য পূরণ করতে হলে আগামী বছরগুলোতে গাছ লাগানোর হার কয়েক গুণ বাড়াতে হবে। বর্তমান ধীরগতির সমাধান হিসেবে ইইউ কিছু নতুন পদক্ষেপের কথা ভাবছে:
১. উদ্ভাবনী পুরস্কার (Awards): নতুন পুরস্কারের মাধ্যমে সংস্থাগুলোকে উৎসাহিত করার পরিকল্পনা করা হয়েছে যাতে তারা গাছ লাগাতে এবং তা রিপোর্ট করতে আগ্রহী হয়।
২. প্রকৃতি পুনরুদ্ধার আইন (Nature Restoration Law): ইইউ সম্প্রতি একটি আইন পাস করেছে যা সদস্য দেশগুলোকে তাদের ক্ষতিগ্রস্ত বাস্তুসংস্থান পুনরুদ্ধারে আইনি বাধ্যবাধকতার মধ্যে আনবে। এটি গাছ লাগানোর হার বাড়াতে সহায়ক হতে পারে।
৩. শহুরে বনায়ন: শুধুমাত্র বিশাল বন তৈরি নয়, বরং শহরের খালি জায়গায় গাছ লাগিয়ে সংখ্যা বাড়ানোর দিকেও নজর দেওয়া হচ্ছে।
কার্বন শোষণে এর প্রভাব
যদি এই ৩ বিলিয়ন গাছ শেষ পর্যন্ত লাগানো সম্ভব হয়, তবে ২০৫০ সাল নাগাদ বছরে ১৫ মিলিয়ন টন CO2 শোষণ করা সম্ভব হবে। কিন্তু বর্তমানের ১.২৬ শতাংশ অগ্রগতির হার বজায় থাকলে এই লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা অসম্ভব হয়ে পড়বে। এর ফলে ইউরোপের জলবায়ু লক্ষ্যমাত্রা (Climate Neutrality by 2050) বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়বে।
বন রক্ষা এবং নতুন গাছ লাগানোর এই অসম লড়াইয়ে ইউরোপীয় ইউনিয়ন শেষ পর্যন্ত সফল হতে পারে কি না, তা নির্ভর করবে আগামী কয়েক বছরে তাদের বিনিয়োগ এবং আইনি পদক্ষেপের ওপর।