শিরোনাম
ডেস্ক রিপোর্ট
প্রকাশ: ১৪:৫১, ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | আপডেট: ১৪:৫২, ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
ব্রাজিলে বন্যা ও ভূমিধসে অন্তত ৩০ জনের প্রাণহানি হয়েছে। ছবি: সংগৃহীত।
ব্রাজিলের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে প্রবল বৃষ্টিপাতের ফলে সৃষ্ট ভূমিধস ও বন্যায় অন্তত ৩০ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং মঙ্গলবার পর্যন্ত ৩৯ জন নিখোঁজ রয়েছেন। মিনাস জেরাইস রাজ্যে নদীগুলোর পানি উপচে জুয়েজ দে ফোরো এবং উবা শহর প্লাবিত হয়েছে। সেখান থেকে ২০০-র বেশি মানুষকে উদ্ধার করা হয়েছে।
দক্ষিণ-পূর্ব ব্রাজিলে ভূমিধসে ঘরবাড়ি ধসে পড়ার পর কাদা ও ধ্বংসস্তূপের মধ্য থেকে তিনজন দমকলকর্মী এক ব্যক্তির মরদেহ উদ্ধার করেছেন, খবর ফ্রান্স টোয়েন্টি ফোর ডট কম-এর। প্রবল বৃষ্টির পর সেখানে এখনো অনেক মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন।
চলতি মাসে রেকর্ড পরিমাণ বৃষ্টিপাতের পর মিনাস জেরাইস রাজ্যের নদীগুলো উপচে পড়ে এবং রাস্তাঘাট কর্দমাক্ত পানির তীব্র স্রোতে ভেসে যায়। সরকারি দমকল বাহিনী জানিয়েছে, জুয়েজ দে ফোরো এবং উবা শহরে ৩০ জন মারা গেছেন। ধ্বংসস্তূপের নিচে নিখোঁজ ৩৯ জনকে খুঁজে বের করতে স্নিফার ডগ নিয়ে কাজ করছেন উদ্ধারকারীরা।
জুয়েজ দে ফোরোর একটি পাহাড়ি এলাকায় 'বিশাল ভূমিধসে' ১২টি বাড়ি বিলীন হয়ে গেছে বলে এএফপি-কে জানান দমকল বাহিনীর মেজর ডিমেট্রিয়াস গৌলার্ট। তিনি বলেন, রাতের বেলা যখন বৃষ্টি হচ্ছিল, তখন অনেক মানুষ তাদের ঘরের ভেতরেই ছিলেন।
উইল্টন আপারেসিডো ডি সুজা তার ২০ বছর বয়সী ছেলের ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে পড়ার কথা বলতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন। ৪২ বছর বয়সী এই বাবা বলেন, ছেলেটি খুব ভালো ছিল, মাত্রই সামরিক সেবা শেষ করেছে এবং একটি মোটরসাইকেল কিনতে চেয়েছিল। তিনি কেবল তার ছেলের মরদেহটুকু পাওয়ার আকুতি জানান, যাতে তাকে যথাযথভাবে দাফন করতে পারেন।
ধ্বংসস্তূপের মাঝে যখন খননকারী যন্ত্রগুলোর শব্দ থামছিল, তখন চারপাশ নিস্তব্ধ হয়ে যাচ্ছিল। মাঝেমধ্যে কেবল আতঙ্কিত কুকুরের ডাক সেই নীরবতা ভাঙছিল। মাটির স্তূপে পড়ে থাকা খেলনা ভাল্লুকগুলো সেখানে একসময় জনজীবনের অস্তিত্বের সাক্ষ্য দিচ্ছিল।
৩২ বছর বয়সী গুদাম কর্মী ক্লেইটন রোনান বলেন, "এই কাদার নিচে চাপা পড়া প্রায় সবাই আমার পরিবারের সদস্য; সেখানে আমার বোন আর ভাগ্নেও আছে।"
এর আগে দমকল বাহিনীর কর্মকর্তা গৌলার্ট জানিয়েছিলেন, দুই ঘণ্টার প্রচেষ্টায় ১০ বছর বয়সী এক শিশুকে ধ্বংসস্তূপ থেকে জীবিত উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। এই খবর অনেকের মনেই তাদের প্রিয়জনদের জীবিত ফিরে পাওয়ার আশা জাগিয়েছিল।
তবে, রাজ্য সিভিল ডিফেন্স সমন্বয়কারী পাউলো রবার্তো বারমুডেস রেজেন্ডে এএফপি-কে জানান, "সময় যত বাড়ছে, জীবিত কাউকে খুঁজে পাওয়ার সম্ভাবনা ততই কমে আসছে।"
দমকল কর্মীদের সাহায্য করতে কোদাল হাতে এগিয়ে এসেছেন স্বেচ্ছাসেবকরাও। ৩৩ বছর বয়সী রাজমিস্ত্রি আতিলা মাউরো বলেন, "যখন আমি বাচ্চাদের জিনিসপত্র—বেলুন, খেলনা ভাল্লুক—খুঁড়ে বের করছিলাম, তখন আমার বুক ফেটে যাচ্ছিল। আমিও একজন বাবা... আমি যেভাবে পারি সাহায্য করার চেষ্টা করছি।"
রাজ্য দমকল বাহিনী জানিয়েছে, প্রবল বৃষ্টির কারণে বন্যা ও ভূমিধস হয়েছে এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ছবিতে ঘরবাড়ি ধসে পড়তে দেখা গেছে।
জুয়েজ দে ফোরোর মেয়র মারগারিদা সালোমাও জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছেন। ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভা এক্স-এ (সাবেক টুইটার) লিখেছেন, "আমাদের মূল লক্ষ্য হলো মানবিক সহায়তা নিশ্চিত করা, মৌলিক সেবাগুলো পুনরায় চালু করা, বাস্তুচ্যুত মানুষদের সাহায্য করা এবং পুনর্গঠন কাজে সহায়তা দেওয়া।"
সালোমাও জানান, পাঁচ লক্ষাধিক মানুষের এই শহরটিতে এবার রেকর্ড পরিমাণ বৃষ্টিপাত হয়েছে। সেখানে সঞ্চিত বৃষ্টির পরিমাণ ছিল ৫৮৪ মিলিমিটার (২৩ ইঞ্চি)। মেয়রের কার্যালয় জানিয়েছে, আনুমানিক ৩,০০০ মানুষকে তাদের ঘরবাড়ি ছাড়তে হয়েছে।
মেয়রের মতে পরিস্থিতি অত্যন্ত 'ভয়াবহ' এবং অন্তত ২০টি ভূমিধসের কারণে কিছু এলাকা পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। রাজ্য কর্তৃপক্ষ সকল মিউনিসিপ্যাল স্কুলের ক্লাস স্থগিত করেছে।
ব্রাজিল সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বন্যা, খরা এবং তীব্র দাবদাহের মতো চরম আবহাওয়াজনিত নানা বিপর্যয়ের সম্মুখীন হয়েছে। ২০২৪ সালে দেশটির দক্ষিণাঞ্চলে নজিরবিহীন বন্যায় ২০০-র বেশি মানুষ মারা যায় এবং ২০ লাখ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়, যা ছিল দেশটির ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ প্রাকৃতিক দুর্যোগ। এর দুই বছর আগে রিও ডি জেনিরোর কাছের পেত্রোপলিস শহরে প্রবল বৃষ্টিতে ২৪১ জন প্রাণ হারিয়েছিলেন।
বিশেষজ্ঞরা এই ধরনের বেশিরভাগ ঘটনার পেছনে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবকে দায়ী করেছেন।