শিরোনাম
ডেস্ক রিপোর্ট
প্রকাশ: ১০:৩৭, ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
কার্বন নিঃসরণ যদি বর্তমান হারে চলতে থাকে, তবে চারণভূমির ক্ষতির পরিমাণ ৬৫% পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে। ছবি: সংগৃহীত।
জলবায়ু পরিবর্তন তীব্র হওয়ার সাথে সাথে তৃণাঞ্চল বা চারণভূমি অর্ধেক সংকুচিত হয়ে যেতে পারে বলে সতর্ক করেছেন গবেষকরা। একটি নতুন বিশ্লেষণ অনুযায়ী, চলতি শতাব্দীর শেষ নাগাদ বিশ্বের প্রায় ১৫০ কোটি গরু, ভেড়া ও ছাগলের জীবনধারণের সহায়ক চারণভূমিগুলো জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে ৩৬% থেকে ৫০% পর্যন্ত হ্রাস পাবে।
পটসডাম ইনস্টিটিউট ফর ক্লাইমেট ইমপ্যাক্ট রিসার্চ (PIK) এই গবেষণাটি পরিচালনা করেছে। তারা জানিয়েছে যে, আফ্রিকার চারণভূমিগুলোর ওপর জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব অত্যন্ত উদ্বেগজনক। আফ্রিকার জলবায়ু পরিস্থিতি বর্তমানে তৃণাঞ্চল টিকে থাকার জন্য প্রায় শেষ সীমায় অবস্থান করছে, খবর আর্থ ডট অর্গ-এর (earth.org)।
যদি জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে নির্গত বৈশ্বিক কার্বন নিঃসরণ নাটকীয়ভাবে কমানো যায়, তবে আফ্রিকার চারণভূমি হয়তো মাত্র ১৬% সংকুচিত হবে। কিন্তু নিঃসরণ যদি বর্তমান হারে চলতে থাকে ("বিজনেস অ্যাজ ইউজুয়াল" পরিস্থিতি), তবে এই ক্ষতির পরিমাণ ৬৫% পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে।
গবেষণার প্রধান লেখক চাওহুই লি এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানান, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বিশ্বব্যাপী এই চারণভূমিগুলো স্থানান্তরিত ও উল্লেখযোগ্যভাবে সংকুচিত হবে, যার ফলে পশুদের চারণের জন্য খুব কম জায়গা অবশিষ্ট থাকবে। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই পরিবর্তনের প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়বে সেই দেশগুলোতে যারা ইতিমধ্যেই ক্ষুধা, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং উচ্চমাত্রার লিঙ্গ বৈষম্যের শিকার।
পশুপালন যেমন জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে হুমকির মুখে, তেমনি এটি নিজেই জলবায়ু পরিবর্তনের অন্যতম কারণ। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (FAO) মতে, বিশ্বব্যাপী গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণের প্রায় ১৪.৫% আসে মাংস ও দুগ্ধ শিল্প থেকে। এদিকে ২০২৫ সালের শেষের দিকে প্রকাশিত দ্বিতীয় 'ইট-ল্যানসেট' (EAT-Lancet) রিপোর্টে দেখা গেছে, খাদ্য উৎপাদন হলো গ্রহের সুরক্ষা সীমা লঙ্ঘনের একক বৃহত্তম কারণ।
চলতি মাসের শুরুতে প্রকাশিত এই গবেষণাটি "সেফ ক্লাইমেটিক স্পেস" বা নিরাপদ জলবায়ু অঞ্চলের ধারণার ওপর ভিত্তি করে তৈরি। চারণভূমির টিকে থাকার জন্য এই নিরাপদ অঞ্চল বলতে -৩ থেকে ২৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা, বছরে ৫০ থেকে ২,৬২৭ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত, ৩৯% থেকে ৬৭% আর্দ্রতা এবং প্রতি সেকেন্ডে ১ থেকে ৬ মিটার বাতাসের গতিবেগকে বোঝায়।
গবেষকরা প্রক্ষেপণ করেছেন যে, ২১০০ সাল নাগাদ চারণযোগ্য এলাকার নিট পরিমাণ ৩৬% থেকে ৫০% কমে যাবে এবং মহাদেশগুলোর অভ্যন্তরে ও এক মহাদেশ থেকে অন্য মহাদেশে এই চারণভূমির উপযুক্ত স্থানগুলো সরে যাবে। ক্ষতিগ্রস্ত জনসংখ্যার ৫১% থেকে ৮১% এমন সব দেশে বাস করে যেখানে আয় কম, তীব্র ক্ষুধা ও লিঙ্গ বৈষম্য বিদ্যমান এবং রাজনৈতিক পরিস্থিতি ভঙ্গুর। গবেষণাটি ভবিষ্যদ্বাণী করেছে যে, ভবিষ্যৎ জলবায়ু পরিবর্তন পৃথিবীর বড় একটি অংশের চারণযোগ্যতাকে হুমকির মুখে ফেলবে, যা অসংখ্য সম্প্রদায়ের জীবিকা বিপন্ন করবে এবং ব্যাপক আর্থ-সামাজিক পরিণতির সৃষ্টি করবে।
যদিও ইথিওপিয়ান উচ্চভূমি, পূর্ব আফ্রিকান রিফ্ট ভ্যালি, কালাহারি বেসিন এবং কঙ্গো বেসিন থেকে কিছু চারণভূমি দক্ষিণ দিকে সরে যাবে, উপকূলীয় চারণভূমিগুলোর সরে যাওয়ার মতো কোনো জায়গা থাকবে না। ইউনিভার্সিটি অফ গ্রোনিংজেনের সহকারী অধ্যাপক এবং গবেষণার সহ-লেখক প্রজল প্রধান বলেন, এই পরিবর্তনগুলো এতই বিশাল যে অতীতে আফ্রিকায় ব্যবহৃত অভিযোজন কৌশলগুলো—যেমন পশুর প্রজাতি পরিবর্তন করা বা পাল নিয়ে অন্য জায়গায় চলে যাওয়া—আর কার্যকর হবে না।
গবেষক দলের মতে, এই ফলাফলগুলো প্রমাণ করে যে জলবায়ু পরিবর্তন বিদ্যমান অসমতাকে আরও বাড়িয়ে তুলবে এবং বৈশ্বিক খাদ্য উৎপাদন ব্যবস্থা ও এর ওপর নির্ভরশীল জনগোষ্ঠীকে অস্থিতিশীল করার ঝুঁকি তৈরি করবে।