শিরোনাম
ইউএনবি
প্রকাশ: ০৮:৫৪, ২১ ডিসেম্বর ২০২৫
ফাইল ছবি: সংগৃহীত।
বিগত এক সপ্তাহে বাংলাদেশের পুঁজিবাজারে বড় ধরনের ধস নেমেছে, যার ফলে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) বাজার মূলধন ১০,৫০০ কোটি টাকারও বেশি কমেছে। শেয়ারের দাম ব্যাপক হারে হ্রাস পাওয়ার কারণে বিনিয়োগকারীরা এই ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছেন।
সপ্তাহের শুরুতে রোববার বাজার মূলধন ছিল ৬,৮৬,৩৬৮ কোটি টাকা, যা বৃহস্পতিবার সপ্তাহ শেষে কমে দাঁড়িয়েছে ৬,৭৫,৮৬৬ কোটি টাকায়। অর্থাৎ মাত্র চার কার্যদিবসে বাজার থেকে ১০,৫০১ কোটি টাকা উধাও হয়ে গেছে। উল্লেখ্য যে, ১৬ই ডিসেম্বর বিজয় দিবসের ছুটির কারণে গত সপ্তাহে স্বাভাবিক পাঁচ দিনের পরিবর্তে চার দিন লেনদেন হয়েছে।
পুঁজিবাজারের এই পরিস্থিতির প্রধান দিকগুলো নিচে দেওয়া হলো:
সূচকের পতন: ডিএসইর প্রধান সূচক ডিএসইএক্স (DSEX) ১৩২ পয়েন্ট বা ২.৬৭ শতাংশ কমে ৪,৮৩১ পয়েন্টে নেমে এসেছে। এক বছর আগে এই সূচকটি ছিল ৫,২১৬ পয়েন্টে। অন্যান্য সূচকের মধ্যে ডিএস৩০ (DS30) ২.২৮ শতাংশ এবং শরীয়াহ ভিত্তিক ডিএসইএস (DSES) ৩.২5 শতাংশ কমেছে।
শেয়ারের দর ওঠানামা: গত সপ্তাহে লেনদেন হওয়া কোম্পানিগুলোর মধ্যে মাত্র ৩২টির দাম বেড়েছে, বিপরীতে ৩৩৫টি কোম্পানির শেয়ারের দাম কমেছে। এছাড়া ২২টি কোম্পানির দাম অপরিবর্তিত ছিল।
লেনদেনের চিত্র: সূচকের পাশাপাশি গড় দৈনিক লেনদেনের পরিমাণও ৭ শতাংশের বেশি কমেছে। সপ্তাহের শুরুতে গড় লেনদেন ৪১৭ কোটি টাকা থাকলেও শেষ কার্যদিবসে তা ৩৮৭ কোটি টাকায় নেমে আসে।
খাতভিত্তিক প্রভাব: ডিএসইর ২১টি খাতের মধ্যে মাত্র ৭টি খাতে সামান্য মূল্যবৃদ্ধি দেখা গেছে। ব্যাংকিং খাতে ৬ শতাংশ এবং অ-ব্যাংকিং আর্থিক প্রতিষ্ঠানে প্রায় ৩২ শতাংশ দরপতন হয়েছে। জীবন বীমা খাতে ৩৮ শতাংশের বিশাল পতন হলেও সাধারণ বীমা খাত উল্টো ১৯ শতাংশ লাভ করেছে।
সার্বিকভাবে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং বড় মূলধনী শেয়ারগুলোর দাম কমে যাওয়ার কারণে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে এক ধরনের সতর্কতা ও শেয়ার বিক্রির প্রবণতা দেখা গেছে, যা বাজারকে নিম্নমুখী করে তুলেছে।
শীর্ষ গেইনার বা দর বৃদ্ধি পাওয়া কোম্পানি
ডিএসইতে শীর্ষ ১০ গেইনারের মধ্যে পাঁচটি ছিল ‘এ’ ক্যাটাগরির কোম্পানি (যারা নিয়মিত ১০ শতাংশ বা তার বেশি লভ্যাংশ দেয়), দুটি ‘বি’ ক্যাটাগরির এবং তিনটি ছিল ‘জেড’ ক্যাটাগরির কোম্পানি। গত সপ্তাহে গেইনার তালিকার বেশিরভাগই ছিল মিউচুয়াল ফান্ড খাতের।
বঙ্গজ লিমিটেড: ‘বি’ ক্যাটাগরির এই কোম্পানিটি তালিকার শীর্ষে ছিল। চার কার্যদিবসে এর শেয়ারের দাম প্রায় ১৫ শতাংশ বেড়ে ১১৩.৫০ টাকা থেকে ১৩০.৫০ টাকায় দাঁড়িয়েছে।
রিলায়েন্স ওয়ান: রিলায়েন্স ইন্স্যুরেন্স মিউচুয়াল ফান্ডের এই স্কিমটি দ্বিতীয় অবস্থানে ছিল। এর ইউনিটের দাম ১৪.৭১ শতাংশ বেড়ে ১৩.৬০ টাকা থেকে ১৫.৬০ টাকা হয়েছে।
সিএপিএম আইবিবিএল ইসলামিক মিউচুয়াল ফান্ড: ১৩ শতাংশের বেশি রিটার্ন নিয়ে এটি তৃতীয় স্থানে ছিল। এর ইউনিটের দাম ৬.৮০ টাকা থেকে বেড়ে ৭.৭০০ টাকা হয়েছে।
বাংলাদেশ ওয়েল্ডিং ইলেকট্রোডস লিমিটেড: ‘জেড’ ক্যাটাগরির এই কোম্পানিটি ৮ শতাংশের বেশি দাম বেড়ে চতুর্থ অবস্থানে ছিল (১২.২০ টাকা থেকে ১৩.২০ টাকা)।
ইউনিয়ন ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি লিমিটেড: ৮ শতাংশ রিটার্ন নিয়ে পঞ্চম স্থানে ছিল এই কোম্পানিটি। এর শেয়ারের দাম ৩২.৫০ টাকা থেকে বেড়ে ৩৫.১০ টাকা হয়েছে।
শীর্ষ লুজার বা দর হারানো কোম্পানি
শীর্ষে থাকা দর হারানো কোম্পানিগুলোর বেশিরভাগই ছিল ‘জেড’ ক্যাটাগরির। তবে এর মধ্যে একটি ‘এ’ এবং একটি ‘বি’ ক্যাটাগরির কোম্পানিও ছিল। তালিকার প্রথম দুটি কোম্পানিই চিনি শিল্পের।
শ্যামপুর সুগার মিলস লিমিটেড: সবচেয়ে বেশি দরপতন হয়েছে এই কোম্পানির। এক সপ্তাহে এর শেয়ারের দাম প্রায় ২১ শতাংশ বা ৪০ টাকারও বেশি কমেছে।
জিল বাংলা সুগার মিলস লিমিটেড: ‘জেড’ ক্যাটাগরির এই চিনি কলটি দ্বিতীয় অবস্থানে ছিল। চার দিনে এর শেয়ারের দাম প্রায় ১৭ শতাংশ বা ৩০ টাকার মতো কমেছে।
এএফসি অ্যাগ্রো বায়োটেক লিমিটেড: প্রায় ১৭ শতাংশ দর হারিয়ে এটি তৃতীয় স্থানে ছিল।
খান ব্রাদার্স পিপি ওভেন ব্যাগ ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড: এর শেয়ারের দাম কমেছে ১৬.৬৪ শতাংশ।
ফাস ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেড: ১৬ শতাংশের বেশি দর হারিয়ে এটি পঞ্চম অবস্থানে ছিল।
সিএসইতে (CSE) বড় পতন
ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের মতো চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জেও (সিএসইতে) বড় ধরনের পতন লক্ষ্য করা গেছে। চার কার্যদিবসের ব্যবধানে এই বাজারের সবকটি সূচক ১.৫ শতাংশের বেশি হ্রাস পেয়েছে।
চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে (সিএসই) সামগ্রিক সূচক কাসপি (CASPI) ২৪৭ পয়েন্ট বা ১.৭৮ শতাংশ কমেছে। অন্যদিকে, ব্লু-চিপ সূচক সিএসই৩০ (CSE30) ২১৭ পয়েন্ট বা ১.৭৬ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। লভ্যাংশ প্রদানকারী 'এ' এবং 'বি' ক্যাটাগরির কোম্পানিগুলোকে নিয়ে গঠিত সিএসসিএক্স (CSCX) সূচকটি ১৪৮ পয়েন্ট বা ১.৭২ শতাংশ কমেছে।
বাজারের অন্যান্য সূচকগুলোর অবস্থাও ছিল নিম্নমুখী:
সিএসই৫০ (CSE50): ১৯ পয়েন্ট বা ১.৭৭ শতাংশ কমেছে।
সিএসআই (CSI - শরীয়াহ ভিত্তিক সূচক): ১৭ পয়েন্ট বা ২.০২ শতাংশ কমেছে।
লেনদেনের চিত্রে দেখা যায়, সিএসইতে লেনদেন হওয়া ২৫০টি কোম্পানির মধ্যে ১৫৯টির দাম কমেছে, ৭১টির বেড়েছে এবং ২০টি কোম্পানির শেয়ার দর অপরিবর্তিত ছিল।
ডিএসইর মতো সিএসইতেও গেইনার বা দর বৃদ্ধির তালিকায় শীর্ষে ছিল বঙ্গজ লিমিটেড। এর পরেই দ্বিতীয় অবস্থানে ছিল জিকিউ বলপেন ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড।
অন্যদিকে, দর হারানোর তালিকায় সিএসইতে সবচেয়ে বেশি পতন হয়েছে অ্যাপেক্স স্পিনিং অ্যান্ড নিটিং মিলস-এর। কোম্পানিটির শেয়ার দর ১৯ শতাংশের বেশি কমেছে। সপ্তাহের শুরুতে এর শেয়ারের দাম ২২০ টাকা থাকলেও সপ্তাহ শেষে তা ১৭৭ টাকায় নেমে আসে। এছাড়া এমারেল্ড অয়েল ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড দর হারানোর তালিকায় দ্বিতীয় স্থানে ছিল; এক সপ্তাহে কোম্পানিটির শেয়ার প্রতি দাম ১৭ শতাংশের বেশি বা প্রায় ৩ টাকা কমেছে।