শিরোনাম
ডেস্ক রিপোর্ট
প্রকাশ: ২০:২৮, ৭ জানুয়ারি ২০২৬
গ্রীণল্যান্ডের একটি গ্রাম। ছবি: সংগৃহীত।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গ্রিনল্যান্ডকে অধিগ্রহণ করার জন্য ‘নানা ধরনের বিকল্প’ নিয়ে আলোচনা করছেন, যার মধ্যে সামরিক শক্তি ব্যবহারের সম্ভাবনাও রয়েছে। হোয়াইট হাউস বিবিসি-কে জানিয়েছে যে, ডেনমার্কের এই স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চলটি দখল করা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য একটি "জাতীয় নিরাপত্তা অগ্রাধিকার"।
আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া ও উত্তেজনা
ডেনমার্কের অবস্থান: ডেনমার্কের প্রধানমন্ত্রী মেটে ফ্রেডেরিকসেন সতর্ক করে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র যদি গ্রিনল্যান্ডে কোনো ধরনের আক্রমণ চালায়, তবে তা হবে ন্যাটোর (NATO) সমাপ্তি, খবর বিবিসি’র।
ইউরোপীয় মিত্রদের সমর্থন: ব্রিটেন, ফ্রান্স, জার্মানি, ইতালি, পোল্যান্ড এবং স্পেন এক যৌথ বিবৃতিতে ডেনমার্কের পাশে দাঁড়িয়েছে। তারা স্পষ্ট জানিয়েছে যে, গ্রিনল্যান্ড তার জনগণের এবং এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার কেবল গ্রিনল্যান্ড ও ডেনমার্কের।
ট্রাম্পের যুক্তি: ট্রাম্পের মতে, নিরাপত্তা জনিত কারণে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য গ্রিনল্যান্ড "প্রয়োজন"। তবে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও জানিয়েছেন, তারা গ্রিনল্যান্ড আক্রমণ করার পরিকল্পনা করছেন না, বরং ডেনমার্কের কাছ থেকে এটি কিনে নেওয়ার কথা ভাবছেন।
কেন গ্রিনল্যান্ড গুরুত্বপূর্ণ?
হোয়াইট হাউস এবং স্টেট ডিপার্টমেন্টের মতে, আর্কটিক অঞ্চলে (উত্তর মেরু এলাকা) প্রতিপক্ষ দেশগুলোর ক্রমবর্ধমান সক্রিয়তা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য উদ্বেগের কারণ। তাই বাণিজ্যিক সম্পর্ক বৃদ্ধি এবং নিরাপত্তার খাতিরে তারা এই দ্বীপটির নিয়ন্ত্রণ নিতে চায়।
ঘটনাপ্রবাহের পরবর্তী অংশ এবং ইউরোপীয় ও গ্রিনল্যান্ডীয় নেতাদের প্রতিক্রিয়া নিচে তুলে ধরা হলো:
ইউরোপীয় ও গ্রিনল্যান্ডীয় নেতাদের অবস্থান
ইউরোপীয় নেতারা আর্কটিক অঞ্চলের নিরাপত্তা রক্ষার গুরুত্ব স্বীকার করলেও তারা জোর দিয়ে বলেছেন যে, এটি অবশ্যই ন্যাটো মিত্রদের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় হতে হবে। তারা জাতিসংঘ সনদের মূলনীতি—বিশেষ করে সার্বভৌমত্ব, আঞ্চলিক অখণ্ডতা এবং সীমানার অলঙ্ঘনীয়তা বজায় রাখার আহ্বান জানিয়েছেন।
গ্রিনল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য: গ্রিনল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী জেনস-ফ্রেডেরিক নিলসেন এই সমর্থনকে স্বাগত জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন, যেকোনো আলোচনা অবশ্যই আন্তর্জাতিক আইন এবং গ্রিনল্যান্ডের আঞ্চলিক অখণ্ডতার প্রতি শ্রদ্ধা রেখে হতে হবে।
জনগণের মতামত: গ্রিনল্যান্ডের অধিকাংশ মানুষ ডেনমার্ক থেকে স্বাধীনতা চাইলেও, যুক্তরাষ্ট্রের অংশ হওয়ার বিষয়ে তাদের চরম বিরোধিতা রয়েছে। গ্রিনল্যান্ডের ইলুলিসাত শহরের ২৭ বছর বয়সী এক ইনুইট (Inuit) নাগরিক জানান, যুক্তরাষ্ট্রের এভাবে দাবি করার বিষয়টি তাদের জন্য অত্যন্ত "ভীতিকর"।
যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর অবস্থান ও উস্কানি
সম্প্রতি ভেনেজুয়েলায় মার্কিন সামরিক হস্তক্ষেপ এবং প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে গ্রেপ্তারের ঘটনার পরপরই গ্রিনল্যান্ড ইস্যুটি পুনরায় আলোচনায় আসে।
মানচিত্র বিতর্ক: ট্রাম্পের এক জ্যেষ্ঠ সহকারীর স্ত্রী ক্যাটি মিলার সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে গ্রিনল্যান্ডের একটি মানচিত্র পোস্ট করেন, যেখানে দ্বীপটিকে মার্কিন পতাকার রঙে রাঙানো ছিল এবং ক্যাপশনে লেখা ছিল "SOON" (শীঘ্রই)।
অ্যানেক্সেশন বা অন্তর্ভুক্তির হুমকি: হোয়াইট হাউসের জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা স্টিফেন মিলার সিএনএন-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, গ্রিনল্যান্ড যুক্তরাষ্ট্রের অংশ হওয়াটাই এখন সরকারের আনুষ্ঠানিক অবস্থান। সামরিক শক্তি প্রয়োগের সম্ভাবনা উড়িয়ে না দিয়ে তিনি দম্ভ করে বলেন, "গ্রিনল্যান্ডের ভবিষ্যৎ নিয়ে কেউ যুক্তরাষ্ট্রের সাথে লড়াই করতে আসবে না।"
স্থানীয় জনগণের উদ্বেগ
গ্রিনল্যান্ডের ইলুলিসাত শহরের বাসিন্দা মরগান বলেন, "আমরা ইতোমধ্যেই গ্রিনল্যান্ডের জনগণের দ্বারা অধিকৃত। আমাদের ভাষায় কালাল্লিট নুনাত (Kalaallit Nunaat) মানেই হলো গ্রিনল্যান্ডের মানুষের দেশ।" তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন যে:
গ্রিনল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রীকেও হয়তো ভেনেজুয়েলার মাদুরোর মতো পরিস্থিতির শিকার হতে হতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি তাদের দেশ আক্রমণ বা দখল (Invasion) করতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের পরিকল্পনায় থাকা বিকল্পসমূহ
রয়টার্স নিউজ এজেন্সিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন মার্কিন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা জানিয়েছেন যে, যুক্তরাষ্ট্র মূলত দুটি পথ নিয়ে ভাবছে: ১. সরাসরি ক্রয়: ডেনমার্কের কাছ থেকে পুরো দ্বীপটি কিনে নেওয়া। ২. কম্প্যাক্ট অফ ফ্রি অ্যাসোসিয়েশন (Compact of Free Association): এটি এমন একটি চুক্তি যেখানে গ্রিনল্যান্ড একটি স্বাধীন দেশ হিসেবে গণ্য হবে কিন্তু এর প্রতিরক্ষা এবং নিরাপত্তার দায়িত্ব থাকবে যুক্তরাষ্ট্রের হাতে (যেমনটি মার্শাল দ্বীপপুঞ্জ বা মাইক্রোনেশিয়ার সাথে রয়েছে)।
মার্কিন সেনেটরের বক্তব্য ও ভূ-রাজনীতি
মিসৌরির রিপাবলিকান সেনেটর এরিক শ্মিট বিষয়টিকে জাতীয় নিরাপত্তার দৃষ্টিকোণ থেকে দেখছেন। তার মতে: "একটি শক্তিশালী আমেরিকা পুরো পশ্চিমা সভ্যতার জন্যই মঙ্গলজনক।"
তিনি আশা প্রকাশ করেন যে ইউরোপ এই পদক্ষেপের প্রয়োজনীয়তা বুঝতে পারবে।