শিরোনাম
ডেস্ক রিপোর্ট
প্রকাশ: ১৩:১৫, ২৫ ডিসেম্বর ২০২৫
প্রতীকি ছবি: সংগৃহীত।
২০২১ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের পর থেকে মিয়ানমার চরম অস্থিতিশীলতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। সম্প্রতি জান্তা সরকার বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোর কাছে বিশাল এলাকা হারিয়েছে। চীনের সাথে মিয়ানমারের দীর্ঘ সীমান্ত এবং সেখানে চীনের বিশাল বিনিয়োগ (বিশেষ করে চীন-মিয়ানমার অর্থনৈতিক করিডোর) থাকায় এই অস্থিরতা বেইজিংয়ের জন্য চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
চীন কেন মিয়ানমারে নির্বাচন চায়?
চীন গণতন্ত্রে বিশ্বাসী না হলেও মিয়ানমারে নির্বাচনকে বর্তমান সংকট থেকে উত্তরণের একটি "কৌশলী পথ" হিসেবে দেখছে। এর কারণগুলো হলো:
যুদ্ধের কারণে সীমান্ত বাণিজ্য ব্যাহত হচ্ছে এবং চীনের তেল ও গ্যাস পাইপলাইনগুলো ঝুঁকির মুখে পড়েছে। চীন মনে করে, একটি নির্বাচিত সরকার (তা সামরিক প্রভাবাধীন হলেও) গৃহযুদ্ধের চেয়ে বেশি স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে পারবে। নিউ ইয়র্ক টাইমসের নিবন্ধ "Why China, a One-Party State, Is Backing Elections in This Country" বলছে, নির্বাচনের মাধ্যমে মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীকে একটি আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ "বৈধতা" দেওয়ার চেষ্টা করছে চীন, যাতে জান্তা সরকারের ওপর থেকে বিশ্বব্যাপী একঘরে হয়ে থাকার চাপ কমে।
সামরিক বাহিনীর ওপর আস্থার অভাব: নিবন্ধে বলা হয়েছে, জান্তা সরকারের অদক্ষতা এবং বিশেষ করে অনলাইন স্ক্যাম (প্রতারণা) কেন্দ্রগুলো বন্ধ করতে ব্যর্থ হওয়ায় বেইজিং তাদের ওপর বিরক্ত। তাই নির্বাচনের মাধ্যমে একটি নতুন রাজনৈতিক বিন্যাস তৈরি করে চীন নিজের স্বার্থ রক্ষা করতে চায়।
একদলীয় রাষ্ট্রের এই পদক্ষেপের বৈপরীত্য
একটি সুন্দর বৈপরীত্য এখানে দেখা যাচ্ছে। যে দেশ নিজের দেশে কোনো নির্বাচন দেয় না, তারা অন্য দেশে ভোট গণনা এবং আদমশুমারির মতো প্রযুক্তিগত সহায়তা দিচ্ছে। বেইজিং মূলত একটি "নিয়ন্ত্রিত" রাজনৈতিক প্রক্রিয়া সেখানে দেখতে চায়, যাতে নতুন সরকার চীনের অনুগত থাকে এবং পশ্চিমা প্রভাব দূরে রাখা যায়।
স্থানীয় জনমত ও প্রতিরোধ
মিয়ানমারের সাধারণ মানুষ এবং জান্তা-বিরোধী গোষ্ঠীগুলো চীনের এই পদক্ষেপকে ভালো চোখে দেখছে না। তারা মনে করে, এই নির্বাচন একটি প্রহসন, যা কেবল সামরিক শাসনকেই পাকাপোক্ত করবে। বেইজিংয়ের এই অবস্থানের কারণে সীমান্ত এলাকার অনেক বিদ্রোহী গোষ্ঠী চীনের ওপর ক্ষুব্ধ হতে পারে।
সারসংক্ষেপ: চীন আসলে মিয়ানমারে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে চায় না, বরং বাস্তবসম্মত রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা চায়। তাদের কাছে একটি স্থিতিশীল এবং চীনের স্বার্থ রক্ষাকারী সরকারই অগ্রাধিকার পায়, সেটি গণতন্ত্রের মাধ্যমে আসুক বা অন্য কোনো উপায়ে।
নিউ ইয়র্ক টাইমসের নিবন্ধের বাকি অংশগুলোর বাংলা অনুবাদ ও বিশ্লেষণ নিচে দেওয়া হলো:
জান্তা সরকারকে "বৈধতা" দেওয়া (A "Laundered" Junta): নির্বাচনের আয়োজন সমর্থন করার মাধ্যমে চীন মূলত মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীকে (স্টেট অ্যাডমিনিস্ট্রেশন কাউন্সিল) আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণভাবে একটি বৈধতার প্রলেপ দিতে চায়। এর উদ্দেশ্য হলো মিয়ানমার জান্তার "একঘরে" বা 'পারিয়া' (Pariah) ভাবমূর্তি দূর করা এবং বিশ্বমঞ্চে তাদের গ্রহণযোগ্যতা বাড়ানো।
সামরিক বাহিনীর ওপর আস্থার অভাব : প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে, বেইজিং জান্তা সরকারের ওপর ক্রমেই বিরক্ত হয়ে উঠছে। এর কারণ জান্তা বাহিনী বিদ্রোহ দমনে ব্যর্থ হয়ে একের পর এক এলাকা হারাচ্ছে। এছাড়া, মিয়ানমার সীমান্তে গড়ে ওঠা টেলিকম স্ক্যাম সেন্টারগুলো (যা চীনা নাগরিকদের প্রতারণার লক্ষ্যবস্তু করত) বন্ধ করতে জান্তার অক্ষমতা চীনকে ক্ষুব্ধ করেছে। তাই নির্বাচনের মাধ্যমে চীন একটি রাজনৈতিক রদবদল চায়, যাতে তাদের স্বার্থ আরও ভালোভাবে সুরক্ষিত থাকে।
মিয়ানমারের সাধারণ মানুষ চীনের এই সমর্থনকে একটি "বিশ্বাসঘাতকতা" হিসেবে দেখছে। দেশটির গণতন্ত্রকামী বিরোধী দল এবং জাতিগত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো মনে করে, এই প্রস্তাবিত নির্বাচন একটি সাজানো নাটক, যার একমাত্র লক্ষ্য হলো সামরিক শাসনকে পাকাপোক্ত করা। নির্বাচনের এই পরিকল্পনায় জান্তার পাশে দাঁড়িয়ে চীন বড় ধরনের ঝুঁকি নিচ্ছে; কারণ তারা সেই সব গোষ্ঠীগুলোকেই নিজেদের শত্রু বানিয়ে ফেলছে যারা বর্তমানে চীন-মিয়ানমার সীমান্তের বিশাল এলাকা নিয়ন্ত্রণ করছে।
এই নিবন্ধটি স্পষ্টভাবে বলছে যে, চীনের এই পদক্ষেপ কোনো গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ থেকে আসেনি, বরং এটি তাদের কঠোর বাস্তববাদী কূটনীতি (Cold-eyed pragmatism)। বেইজিংয়ের কাছে একটি অরাজক ও যুদ্ধবিধ্বস্ত প্রতিবেশী রাষ্ট্রের চেয়ে একটি "শৃঙ্খলিত" এবং অনুগত প্রতিবেশী অনেক বেশি কাম্য—ভলে সেটি নির্বাচনের মাধ্যমেই আসুক না কেন। চীন মনে করে, গৃহযুদ্ধের অবসান ঘটলেই কেবল তাদের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে। (নিউ ইয়র্ক টাইমসের নিবন্ধ "Why China, a One-Party State, Is Backing Elections in This Country" রিপোর্ট অবলম্বনে)।