শিরোনাম
ডেস্ক রিপোর্ট
প্রকাশ: ১৩:০৮, ২০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
জাপানের চেরি বাগানের ফুল পৃথিবী-ব্যাপী পর্যটকদের মূল আকর্ষণ। ছবি: সংগৃহীত।
বিশ্বজুড়ে পর্যটকদের সংখ্যা ১৮০ কোটির দিকে ধাবিত হওয়ায়, উপচে পড়া ভিড় সামলাতে জনপ্রিয় পর্যটন কেন্দ্রগুলো এখন বেশ কিছু বিতর্কিত ও কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করছে।
জাপানের মাউন্ট ফুজি’র পাদদেশে চেরি ফুল (সাকুরা) আগের মতোই ফুটছে, পর্যটকরাও আসছেন—কিন্তু এ বছর সেখানে কোনো উৎসব নেই। জাপানের ফুজিইয়োশিদা শহরের কর্তৃপক্ষ তাদের বার্ষিক চেরি ব্লসম উৎসব বাতিল করেছে। সাধারণত এই উৎসবে প্রায় ২ লাখ দর্শনার্থীর সমাগম ঘটে, খবর বিবিসি’র।
কিন্তু পর্যটকদের যত্রতত্র ময়লা ফেলা, অনধিকার প্রবেশ এবং এমনকি মানুষের ব্যক্তিগত শোবার ঘরে ঢুকে পড়ার মতো বিরক্তিকর আচরণের অভিযোগে অতিষ্ঠ হয়ে স্থানীয় বাসিন্দারা অভিযোগ জানালে প্রশাসন এই সিদ্ধান্ত নেয়। এটি একটি স্পষ্ট সংকেত যে, বিশ্বজুড়ে পর্যটনের রেকর্ড উল্লম্ফনের সাথে সাথে জনপ্রিয় গন্তব্যগুলোর ধৈর্যও এখন ফুরিয়ে আসছে।
২০২৫ সালে জাপান রেকর্ড সংখ্যক ৪.৩ কোটি পর্যটককে স্বাগত জানিয়েছে। অন্যদিকে, বিশ্বের মোট ১৫০ কোটি আন্তর্জাতিক পর্যটকের অর্ধেকেরও বেশি ভ্রমণ করেছেন ইউরোপে। ২০৩০ সালের মধ্যে এই সংখ্যা ১৮০ কোটিতে পৌঁছাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে, যা সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে সরকারগুলো।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে অনেক দেশ এমন সব পদক্ষেপ নিচ্ছে যা কয়েক বছর আগেও চরমপন্থা বলে মনে হতো। যেমন—ভিড় নিয়ন্ত্রণে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) ব্যবহার, চলাচলে বাধা দিতে বেড়া বা ব্যারিকেড দেওয়া, বিদেশিদের জন্য তিনগুণ প্রবেশ ফি নির্ধারণ এবং এমনকি আইকনিক বা ঐতিহ্যবাহী সব উৎসব বাতিল করা।
যদিও এসব দেশ পর্যটকদের স্বাগত জানাতে চায়, কিন্তু তারা চাইছে পর্যটকরা যেন নির্দিষ্ট সময়ে গাদা না করে সারা বছর ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আসে এবং স্থানীয় নিয়ম-কানুন মেনে চলে। জাপানের মতো দেশগুলো এখন যে ধরণের কঠোর পদক্ষেপ নিচ্ছে, তার একটি সংক্ষিপ্ত চিত্র নিচে দেওয়া হলো:
জাপান: বাধা ও সীমাবদ্ধতা
চেরি ব্লসম উৎসব বাতিল করা জাপানের অতি-পর্যটন (Overtourism) নিয়ন্ত্রণের সর্বশেষ ধাপ মাত্র। ২০২৪ সালে ফুজিকাওয়াগুচিকো শহর মাউন্ট ফুজির ছবি তোলার একটি জনপ্রিয় পয়েন্টে কৃত্রিম পর্দা বা ব্যারিকেড বসিয়ে দিয়েছিল। কারণ পর্যটকরা ছবি তুলতে গিয়ে ছাদে চড়ছিল এবং নিরাপত্তা কর্মীদের নির্দেশনা উপেক্ষা করছিল।
কিয়োটো শহরও দীর্ঘকাল ধরে অতিরিক্ত ভিড়ের সমস্যায় জর্জরিত। তারা এখন ঐতিহাসিক গিওন জেলায় 'গেইশা'দের ছবি তোলা নিষিদ্ধ করেছে এবং কিছু নির্দিষ্ট গলিপথে পর্যটকদের প্রবেশাধিকার সীমিত করেছে। তবে কঠোরতার পাশাপাশি তারা প্রযুক্তির সাহায্যও নিচ্ছে:
কনজেশন ফোরকাস্ট টুল: এই ডিজিটাল টুলের মাধ্যমে পর্যটকরা জানতে পারেন কোন দিন বা কোন সময়ে দর্শনীয় স্থানগুলোতে ভিড় কম থাকবে।
স্মার্ট নেভিগেশন অ্যাপ: এটি ভিড়ের রিয়েল-টাইম আপডেট দেয়।
হিডেন জেমস উদ্যোগ: মূল মন্দিরের ভিড় এড়াতে পর্যটকদের তুলনামূলক শান্ত ও স্বল্প পরিচিত ছয়টি জেলা ভ্রমণে উৎসাহিত করা হচ্ছে।
হ্যান্ডস ফ্রি কিয়োটো: গণপরিবহনে ভিড় কমাতে পর্যটকদের লাগেজ পরিবহন ও স্টোরেজ সেবা দেওয়া হচ্ছে।
কিয়োটোর টেকসই পর্যটন প্রচার বিভাগের ব্যবস্থাপক কৌসাকু ওনোর মতে, "অতি-পর্যটন সমস্যার কোনো জাদুকরী সমাধান নেই। আমাদের লক্ষ্য হলো নাগরিকদের দৈনন্দিন জীবন রক্ষা করা এবং একই সঙ্গে পর্যটকদের আরামদায়ক ভ্রমণ নিশ্চিত করা।"
বিশ্বের অন্যান্য প্রান্তেও এই সমস্যা সমাধানে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। আপনার দেওয়া তথ্যের বাকি অংশের অনুবাদ নিচে দেওয়া হলো:
ট্যুর অপারেটরদের কৌশল পরিবর্তন
পর্যটন সংস্থাগুলোও এখন তাদের ব্যবসায়িক মডেলে পরিবর্তন আনছে। যেমন—'ইনসাইড ট্রাভেল গ্রুপ' জাপানের অতি-পরিচিত শহরগুলোর বদলে পাঁচটি স্বল্প-পরিচিত অঞ্চলের (তোয়ামা, নাগোয়া, নাগাসাকি, আওমোরি এবং ইয়ামাগুচি) ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে। কোম্পানির ম্যানেজিং ডিরেক্টর টিম ওকস বলেন, "অতি-পর্যটন ভবিষ্যতের ভ্রমণের জন্য বড় হুমকি। এই জায়গাগুলো পর্যটক চায়, কিন্তু উপচে পড়া ভিড় নয়।"
যুক্তরাষ্ট্র: বিদেশি পর্যটকদের জন্য অতিরিক্ত ফি
যুক্তরাষ্ট্র এই সমস্যা মোকাবিলায় আর্থিক নীতি গ্রহণ করেছে। দেশটির বিশাল ন্যাশনাল পার্ক সিস্টেমে ৪৩৩টি পার্ক থাকলেও, মোট দর্শনার্থীর অর্ধেকই ভিড় করে মাত্র ২৫টি জনপ্রিয় পার্কে। এর ফলে দীর্ঘ লাইন এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনার সমস্যা তৈরি হচ্ছে।
নতুন ফি (২০২৬): ইয়েলোস্টোন, ইয়োসেমাইট এবং গ্র্যান্ড ক্যানিয়নের মতো ১১টি জনপ্রিয় পার্কে বিদেশি পর্যটকদের জন্য মাথাপিছু ১০০ ডলার সারচার্জ বা অতিরিক্ত ফি নির্ধারণ করা হয়েছে।
আমেরিকা দ্য বিউটিফুল পাস: মার্কিন নাগরিকদের জন্য এই পাসের দাম ৮০ ডলার হলেও, বিদেশিদের জন্য তা বাড়িয়ে ২৫০ ডলার করা হয়েছে।
চ্যালেঞ্জ ও সমালোচনা
এই নীতি কার্যকর করতে গিয়ে প্রবেশপথে পর্যটকদের নাগরিকত্ব যাচাই এবং আইডি চেক করার কারণে লাইনের দৈর্ঘ্য আরও বেড়ে যাচ্ছে বলে জানা গেছে। অনেক বিশেষজ্ঞ মনে করেন, কেবল দাম বাড়িয়ে ভিড় কমানো সম্ভব নয়।
কেভিন জ্যাকসন (EXP Journeys): তিনি মনে করেন, আইকনিক পার্কগুলোর চাহিদা এতোই বেশি যে, উচ্চবিত্ত পর্যটকদের কাছে এই বাড়তি ফি খুব সামান্য। তবে এটি কিছু পর্যটককে কম পরিচিত পার্কগুলোর (যেমন ইউটাহ-র ক্যানিয়নল্যান্ডস) দিকে ধাবিত করতে পারে।
দুলানি পোর্টার (SPARK): তাঁর মতে, "মূল্য নির্ধারণ কোনো পর্যটন ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা নয়।" তিনি মনে করেন, ভিড়ের মূল কারণ হলো অভ্যন্তরীণ ছুটির ক্যালেন্ডার এবং সীমিত রাস্তা ও পার্কিং ক্ষমতা। এছাড়া বিদেশিদের নিরুৎসাহিত করলে স্থানীয় হোটেল ও রেস্তোরাঁ ব্যবসায় নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
জ্যামাইকা: সীমাবদ্ধতার বদলে উৎসাহ

জাপান বা আমেরিকার মতো কঠোর না হয়ে জ্যামাইকা পর্যটকদের উৎসাহিত করার পথ বেছে নিয়েছে। ২০২৫ সালে হারিকেন মেলিসার ধ্বংসযজ্ঞের পর পর্যটকদের ফিরিয়ে আনতে তারা অভিনব এক উদ্যোগ নিয়েছে। 'অফ-পিক' বা পর্যটন মৌসুম নয় এমন সময়ে (যেমন বর্ষা বা হারিকেন সিজনে) পর্যটকদের আকৃষ্ট করতে তারা 'রেইন কভারেজ' বা বৃষ্টির বীমা সুবিধা দিচ্ছে।কীভাবে কাজ করে: মার্চ থেকে নভেম্বর পর্যন্ত যারা জ্যামাইকা ভ্রমণের প্যাকেজ বুক করবেন, তাদের ভ্রমণে যদি অতিরিক্ত বৃষ্টি হয়, তবে তারা স্বয়ংক্রিয়ভাবে অর্থ ফেরত (Refund) পাবেন। অথচ তাদের ভ্রমণ বাতিল হবে না; তারা চাইলে কিংস্টনের বব মার্লে মিউজিয়াম বা নাসা ভ্যালিতে রাম টেস্টিং-এর মতো ইনডোর আকর্ষণগুলো উপভোগ করতে পারবেন।
স্পেন: অ্যালগরিদমিক ভিড় ব্যবস্থাপনা
স্পেনের ম্যালোর্কা দ্বীপটি অতিরিক্ত পর্যটনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের জন্য পরিচিত। তারা এখন এই সমস্যা সমাধানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) ব্যবহার করছে।
এ বছর তারা একটি এআই-চালিত প্ল্যাটফর্ম চালু করবে যা রিয়েল-টাইম ডেটা ব্যবহার করে পর্যটকদের জানাবে কোন সময়ে জনপ্রিয় স্থানগুলোতে ভিড় কম থাকবে।এছাড়া এটি পর্যটকদের প্রথাগত সমুদ্র সৈকতের বাইরে স্থানীয় ঐতিহ্যবাহী কাঁচশিল্প (Glassblowing) বা জলপাই তেলের খামার পরিদর্শনের মতো বিকল্প জায়গার পরামর্শ দেবে।
ডেনমার্ক: আচরণগত পরিবর্তন ও পুরস্কার
ডেনমার্কের রাজধানী কোপেনহেগেন ২০৩০ সালের মধ্যে পর্যটক সংখ্যা ২৪% বৃদ্ধির পূর্বাভাস দিচ্ছে। এই ভিড় সামলাতে তারা 'CopenPay' নামে একটি চমৎকার প্রকল্প চালু করেছে।
কাজের ধরণ: এখানে পর্যটকরা টাকা নয়, বরং টেকসই বা পরিবেশবান্ধব কাজের মাধ্যমে বিভিন্ন অভিজ্ঞতা "ক্রয়" করতে পারেন। যেমন—বাইসাইকেলে করে মিউজিয়ামে আসা বা কায়াকিং করার সময় খাল থেকে ময়লা পরিষ্কার করা।
ফলাফল: ৩০,০০০-এর বেশি পর্যটক এতে অংশ নিয়েছেন এবং এর ফলে শহরটিতে সাইকেল ভাড়া ৫৯% বেড়েছে। মজার ব্যাপার হলো, ৭০% অংশগ্রহণকারী জানিয়েছেন তারা এই পরিবেশবান্ধব অভ্যাসগুলো (যেমন বর্জ্য পৃথকীকরণ) নিজেদের দেশে গিয়েও মেনে চলছেন।
বার্লিন এবং নরম্যান্ডিও এখন ডেনমার্কের এই মডেল অনুসরণ করার কথা ভাবছে।