শিরোনাম
ডেস্ক রিপোর্ট
প্রকাশ: ১০:৫৬, ১১ মার্চ ২০২৬ | আপডেট: ১১:০১, ১১ মার্চ ২০২৬
প্রতীকি ছবি: সংগৃহীত।
মানসিক চাপগ্রস্ত কর্মব্যস্ত পেশাদারদের মধ্যে প্রাচীন চীনা অ্যারোমাথেরাপির নতুন বাজার তৈরি হচ্ছে।
লি কিনরুই তার সোফায় গা এলিয়ে দিলেন, অফিসের ব্যস্ত দিনের স্মৃতি তখনও তার মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে। বাইরে বেইজিং শহর তার নিজস্ব ছন্দে মুখর, কিন্তু লির অ্যাপার্টমেন্টের ভেতরের জগতটা একদম আলাদা।
তিনি টেবিল থেকে চীনা ধূপকাঠির একটি ছোট বাক্স টেনে নিলেন এবং একটি চন্দন কাঠের কাঠি বেছে নিলেন। লাইটারের মৃদু শিখায় ধূপটি জ্বলে উঠতেই এর সুবাস ঘর ভরে তুলল, যা তাকে এক আরামদায়ক আলিঙ্গনের মতো জড়িয়ে ধরল, ফিচার চায়না ডেইলীর।
ধোঁয়া যখন কুণ্ডলী পাকিয়ে উপরের দিকে উঠছে, ৩৬ বছর বয়সী এই ইন্টারনেট কোম্পানির প্রজেক্ট ম্যানেজার অনুভব করলেন সারাদিনের মানসিক চাপ ধীরে ধীরে কমছে। বাইরের জগতের সেই হুরোহুরি আর শোরগোল যেন ম্লান হয়ে গেল।
তিনি বলেন, "এই ধূপ কেবল একটি সুগন্ধি নয়; এটি একটি আচার, আমার ব্যস্ত জীবনে শান্তির একটি মুহূর্ত। একটি ধূপকাঠি জ্বালানো আমাকে কাজ থেকে বিচ্ছিন্ন হতে, গতি কমাতে এবং নিজেকে পুনর্গঠন করতে সাহায্য করে। ধোঁয়া যত উপরে ওঠে, আমার মানসিক চাপ ততই গলে জল হয়ে যায়।"
লি 'শাওহংশু' এবং 'ডুইন'-এর মতো সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে এই চীনা ধূপের সন্ধান পান, যা বর্তমানে একে জনপ্রিয় করতে বড় ভূমিকা পালন করছে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে, প্রাচীন ঐতিহ্যের সাথে সমসাময়িক রুচির মিশেলে চীনা অ্যারোমাথেরাপি তরুণ প্রজন্মের মধ্যে এক নতুন লাইফস্টাইল ট্রেন্ড হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। ইনফ্লুয়েন্সার এবং ব্লগাররা তাদের ধূপ জ্বালানোর আচারের ভিডিও শেয়ার করছেন, যেখানে বিভিন্ন সুগন্ধি, তৈরির কৌশল এবং ধূপ ব্যবহারের মানসিক স্বাস্থ্যগত উপকারিতা বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হচ্ছে।
'টু সামার' (To Summer), 'ডকুমেন্টস' (Documents) এবং 'সং চাও' (Song Chao)-এর মতো চীনা অ্যারোমাথেরাপি ব্র্যান্ডগুলো দেশের সুগন্ধি জগতকে নতুন করে সংজ্ঞায়িত করছে। চা-এর ঘ্রাণ থেকে শুরু করে ওসমানথাস, প্লাম ব্লসম এবং পদ্মের মতো নিখুঁত প্রাচ্যদেশীয় সুবাসের আধিক্য এখন বাজারে লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
চায়না ইনসেনস কালচার রিসার্চ ইনস্টিটিউটের মতে, চীনে ধূপের ইতিহাস বসন্ত ও শরৎকাল (৭৭০-৪৭৬ খ্রিস্টপূর্বাব্দ) এবং যুদ্ধরত রাজ্যগুলোর সময়কাল (৪৭৫-২২১ খ্রিস্টপূর্বাব্দ) পর্যন্ত বিস্তৃত, যখন এটি প্রথম আচার এবং ধর্মীয় উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হত।
ধূপ বৌদ্ধ ও তাওবাদী আচারের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছিল, যা পবিত্রতা এবং শ্রদ্ধার প্রতীক হিসেবে গণ্য হতো। প্রার্থনা চলাকালীন এটি জ্বালানো হতো। টাং রাজবংশের (৬১৮-৯০৭) সময় বৌদ্ধ ধর্মের প্রসারের সাথে সাথে ধূপ মন্দির ও গৃহস্থালিতে সমানভাবে ছড়িয়ে পড়ে এবং ধর্মের গণ্ডি পেরিয়ে এটি প্রকৃতি ও আধ্যাত্মিক জগতের সেতুবন্ধন হিসেবে দৈনন্দিন জীবনের অংশ হয়ে ওঠে। সং রাজবংশের (৯৬০-১২৭৯) সময়ে ধূপ 'শিয়াংদাও' বা 'ধূপের পথ'-এ বিবর্তিত হয়, যা ছিল সচেতন প্রশংসা এবং ধ্যানের মাধ্যমে আনন্দ পাওয়ার একটি পরিশীলিত শিল্প।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে চীনা ধূপ নিঃশব্দে পুনরায় ফিরে এসেছে। ২০২৫ সালের চীনের সুগন্ধি ও অ্যারোমাথেরাপি শিল্পের প্রবণতা বিশ্লেষণ সংক্রান্ত একটি প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৪ সালে পারফিউম, গাড়ির সুগন্ধি, হোম ফ্র্যাগ্রেন্স এবং ব্যক্তিগত পরিচর্যার পণ্যসহ চীনের সুগন্ধি ও অ্যারোমাথেরাপি বাজারের আকার ২৭.৮ বিলিয়ন ইউয়ানে (প্রায় ৪.০৪ বিলিয়ন ডলার) পৌঁছেছে।
শিল্প বিশ্লেষক জু রু-র মতে, চীনের "সুগন্ধি অর্থনীতি" বা "সেন্ট ইকোনমি" দ্রুত প্রসারিত হচ্ছে। তিনি উল্লেখ করেন, "এটি এখন আর কেবল পারফিউম বা ধূপকাঠি কেনার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই।"
সুগন্ধি নিয়ে বিভিন্ন অভিজ্ঞতামূলক কর্মকাণ্ডও বর্তমানে তুঙ্গে। এমন অনেক কর্মশালা (ওয়ার্কশপ) চালু হয়েছে যেখানে অংশগ্রহণকারীদের শেখানো হয় কীভাবে কাঁচামাল চিনতে হয় এবং নিজের পছন্দমতো অনন্য সুবাস তৈরি করতে হয়।
জু আরও যোগ করেন, "এই অভিজ্ঞতাগুলো সুগন্ধিকে একটি জীবনযাত্রার পছন্দে পরিণত করছে। তরুণ ক্রেতারা শিথিল হতে, নিজেকে প্রকাশ করতে এবং সংস্কৃতির সাথে যুক্ত হতে সুবাস ব্যবহার করছেন। তাঁদের কাছে সুগন্ধি হলো স্টাইল, সংস্কৃতি এবং পরিচয়ের বহিঃপ্রকাশ। দেশীয় ব্র্যান্ডগুলো সমসাময়িক চীনে সুগন্ধি ব্যবহারের সংজ্ঞাকেই বদলে দিচ্ছে।"
২৫ বছর বয়সী ঝাং জুনফেং শহরের তরুণদের মধ্যে এই ঐতিহ্যবাহী সুবাসের প্রতি ক্রমবর্ধমান আগ্রহ দেখে অনুপ্রাণিত হয়ে নিজের একটি ধূপকাঠির ব্র্যান্ড চালু করেছেন।
ঝাং এবং তাঁর ব্যবসায়িক অংশীদার (যিনি কম্পিউটার সায়েন্সের ছাত্র) মিলে একটি 'ধূপ সুগন্ধি ক্যালকুলেটর' তৈরি করেছেন। ব্যবহারকারীরা চন্দন বা ল্যাভেন্ডারের মতো মূল উপাদানের পাশাপাশি সাইট্রাস বা মশলার মতো বাড়তি সুবাস নির্বাচন করতে পারেন। এই টুলটি প্রতিটি উপাদানের সুগন্ধি গুণাবলী এবং সাংস্কৃতিক ইতিহাস সম্পর্কে ব্যবহারকারীদের শিক্ষা দেয় এবং সঠিক মিশ্রণের অনুপাত বাতলে দেয়।
ঝাং বলেন, "আমরা চাই তরুণরা ধূপ তৈরির এই প্রাচীন শিল্পের সাথে যুক্ত হোক। আমাদের লক্ষ্য হলো আধুনিক প্রেক্ষাপটে একে সহজলভ্য এবং প্রাসঙ্গিক করে তোলা, যাতে নতুন প্রজন্মের মধ্যে সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের প্রতি গভীর অনুরাগ তৈরি হয়।"