শিরোনাম
ডেস্ক রিপোর্ট
প্রকাশ: ১১:৪৮, ১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
প্রতিনিধিত্বশীল ছবি: সংগৃহীত।
জেনারেশন জে বা জেন জি-র বিক্ষোভের পরবর্তী রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে সরবরাহ ব্যবস্থা ব্যাহত হওয়ায় চলতি অর্থবছরের প্রথম চার মাসে খাদ্যপণ্যের দাম কয়েকগুণ বেড়ে গেছে। সরকারি এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, কিছু পণ্যের দাম আট গুণ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে।
বাণিজ্য, সরবরাহ ও ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের ডিসেম্বর মাসের মূল্য বিশ্লেষণ প্রতিবেদন বলছে যে, কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া পর্যালোচনাকালীন সময়ে প্রায় সব ধরনের খাদ্যপণ্যের দামই ছিল অস্থিতিশীল এবং ঊর্ধ্বমুখী। চাল, ডাল, মাংস এবং মাংসজাত পণ্যের দাম ক্রমাগত বেড়েছে। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে, মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্যের কারণে উৎপাদন পর্যায়ের তুলনায় খুচরা পর্যায়ে সবজি, ফল ও অন্যান্য খাদ্যপণ্যের দাম অনেক বেশি বেড়েছে, খবর কাঠমান্ডু পোস্টের।
জুলাইয়ের মাঝামাঝি থেকে আগস্টের মাঝামাঝি পর্যন্ত মৌসুমি সবজি ও ফলের সরবরাহ ভালো থাকায় দাম কিছুটা কম ছিল। তবে সেপ্টেম্বর থেকে জেন জি-র নেতৃত্বে শুরু হওয়া আন্দোলনের পর রাজনৈতিক অস্থিরতার সুযোগ নিয়ে অসাধু ব্যবসায়ীরা দাম বাড়াতে শুরু করেন। এই সময়ে করলার দাম অস্বাভাবিকভাবে ৮০০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। বরবটির দামেও একই হারে লাফ লক্ষ্য করা গেছে।
অভ্যন্তরীণ কারণ ছাড়াও জ্বালানি তেলের মূল্য এবং বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হারের পরিবর্তন খাদ্যপণ্যের দামে প্রভাব ফেলেছে। পর্যালোচনাকালীন সময়ে ডিজেল ও কেরোসিনের দাম লিটারপ্রতি ৩ রুপি কমলেও পেট্রোলের দাম বেড়েছে ২ রুপি। এছাড়া মার্কিন ডলারের বিপরীতে নেপালি রুপির মান ২ শতাংশ কমে যাওয়ায় আমদানিকৃত পণ্যের ওপর বাড়তি চাপের সৃষ্টি হয়েছে।
মধ্যস্বত্বভোগীদের দাপট কমাতে প্রতিবেদনে কর্পোরেশন, সমবায় এবং বাণিজ্যিক অংশীদারিত্বের মতো বিকল্প বাজার ব্যবস্থা গড়ে তোলার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। তবে এই প্রতিবেদনটি নেপালের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাম্প্রতিক সামষ্টিক অর্থনৈতিক প্রতিবেদনের সাথে কিছুটা সাংঘর্ষিক। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্যমতে, ডিসেম্বরের মাঝামাঝি সময়ে মূল্যস্ফীতি ১.৬৩ শতাংশে নেমে এসেছে, যা আগের বছরের একই সময়ে ছিল ৬.০৫ শতাংশ।
খাদ্য ও পানীয় বিভাগের অধীনে, গত বছরের তুলনায় ঘি ও তেলের দাম ৫.৫২ শতাংশ, অ্যালকোহলমুক্ত পানীয়ের দাম ৩.৫৬ শতাংশ এবং দুগ্ধজাত পণ্য ও ডিমের দাম ২.৪৪ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। অন্যদিকে সবজির দাম ৮.৫৪ শতাংশ, মশলার দাম ৮.৪৩ শতাংশ এবং ডাল ও শিম জাতীয় শস্যের দাম ৫.৭৯ শতাংশ কমেছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাবেক নির্বাহী পরিচালক গুনাকর ভট্ট জানান, ভিন্ন ভিন্ন সময়ের সাথে তুলনা করার কারণে দুটি প্রতিবেদনের তথ্যে অমিল দেখা দিতে পারে। তিনি বলেন, "রাষ্ট্র ব্যাংক গত অর্থবছরের তথ্যের সাথে তুলনা করেছে, অন্যদিকে বাণিজ্য অধিদপ্তরের প্রতিবেদনটি চলতি অর্থবছরের বিভিন্ন মাসের তুলনামূলক তথ্যের ওপর ভিত্তি করে তৈরি।"
ভোক্তা অধিকার কর্মীদের দাবি, রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় মধ্যস্বত্বভোগীরা সক্রিয় থাকায় নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম অস্বাভাবিকভাবে বাড়ছে। ফোরাম ফর প্রোটেকশন অফ কনজিউমার রাইটস-নেপালের সাধারণ সম্পাদক বিষ্ণু প্রসাদ তিমিলসিনা বলেন, মধ্যস্বত্বভোগীদের ভূমিকা নিয়ে শুধু প্রতিবেদন প্রকাশ করাই যথেষ্ট নয়।
তিনি বলেন, "যেসব মধ্যস্বত্বভোগী কৃত্রিমভাবে দাম বাড়াচ্ছে, অধিদপ্তরের উচিত তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া। উৎপাদন পর্যায় এবং ভোক্তা পর্যায়ের দামের ব্যবধান অনেক বেশি, যা কঠোরভাবে তদারকি করা প্রয়োজন।" তিমিলসিনার মতে, যতক্ষণ না সরকার মধ্যস্বত্বভোগীদের শনাক্ত করে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিচ্ছে, ততক্ষণ দাম কমবে না।
তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, যেসব দোকানে মূল্য তালিকা টাঙানো নেই, প্রচলিত আইন অনুযায়ী তাদের দ্রুত জরিমানা করা উচিত। বড় পাইকারি বিক্রেতাদের উচিত ভোক্তাদের স্বার্থ বিবেচনা করা এবং হঠাৎ করে দাম না বাড়ানো। তিনি মনে করেন, মুক্তবাজার অর্থনীতিতে প্রতিযোগিতা থাকলেও বাজার অনিয়ন্ত্রিত হয়ে পড়লে সরকারের নিয়ন্ত্রণমূলক তদারকি জরুরি।
এই প্রতিবেদনের জন্য বিরাটনগর, বীরগঞ্জ, ভৈরহওয়া, নেপালগঞ্জ এবং ধানগড়িতে অবস্থিত বাণিজ্য অধিদপ্তরের পাঁচটি কার্যালয় জুলাইয়ের মাঝামাঝি থেকে নভেম্বরের মাঝামাঝি পর্যন্ত খাদ্যপণ্যের মাসিক গড় দাম সংগ্রহ করেছে।
প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, এই চার মাসে সোনা মনসুলি চালের দাম কেজিপ্রতি ১৯ রুপি, স্টিমড জিরা মাসিনো ১৮ রুপি, সাধারণ জিরা মাসিনো ১৫ রুপি, বাসমতি ৬৬ রুপি এবং মোটা চালের দাম ১৯ রুপি বেড়েছে। জরিপ করা শহরগুলোর মধ্যে ভৈরহওয়ায় বাসমতি চালের দাম সবচেয়ে বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে।ডালজাতীয় পণ্যের দামেও ব্যাপক ঊর্ধ্বগতি দেখা গেছে। পর্যালোচনাকালীন সময়ে মসুর ডালের দাম গড়ে কেজিপ্রতি ২৭ রুপি, মাষকলাইয়ের ডাল ৪৭ রুপি, কালো কলাই ডাল ২৩ রুপি, পালিশ করা ছোলা ৩৪ রুপি, পালিশবিহীন ছোলা ২৪ রুপি এবং মুগ ডালের দাম ৫৮ রুপি বৃদ্ধি পেয়েছে।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে, মূল্যের এই ধারাবাহিক ওঠানামা মানুষের জীবনযাত্রার মানের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলেছে। ভোজ্য তেলের গড় দামও ব্যাপকভাবে বেড়েছে, যার মধ্যে সরিষার তেল লিটারপ্রতি ১২৮ রুপি, সয়াবিন তেল ৪০ রুপি এবং সূর্যমুখী তেল ২৬ রুপি বেড়েছে।
সামগ্রিকভাবে, ডালের গড় দাম কেজিপ্রতি ৩৮ রুপি, সাদা মটর ৪৯ রুপি এবং রাজমাসহ অন্যান্য শিমের বিচি ৫৩ রুপি বৃদ্ধি পেয়েছে। অর্থবছরের প্রথম চার মাসে জিরার দাম গড়ে কেজিপ্রতি ১৩৫ রুপি এবং ধনের দাম ৫৫ রুপি বেড়েছে।
আমিষ জাতীয় খাদ্যের দামও চড়া হয়েছে। ডিমের দাম প্রতি পিস গড়ে ৫ রুপি, খাসির মাংস কেজিপ্রতি ৫৪ রুপি এবং ব্রয়লার মুরগির দাম ১১৬ রুপি বেড়েছে।
সবজির দামেও একই প্রবণতা দেখা গেছে, যেখানে টমেটোর দাম গড়ে কেজিপ্রতি ৬৭ রুপি বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলের দামও লাফিয়ে বেড়েছে; পর্যালোচনাকালীন সময়ে আপেলের দাম কেজিপ্রতি ১১৬ রুপি এবং কলার দাম ডজনপ্রতি গড়ে ৭৩ রুপি বেড়েছে।