শিরোনাম
গীতা পান্ডে, বিবিসি নিউজ বাংলা
প্রকাশ: ২১:৩১, ২৪ নভেম্বর ২০২৫ | আপডেট: ২১:৩৫, ২৪ নভেম্বর ২০২৫
ধর্মেন্দ্র ৩০০ টিরও বেশি ছবিতে অভিনয় করেছেন, বহু হিট সিনেমা দিয়ে দশকের পর দশক ধরে দর্শকদের মনে রাজত্ব করেছেন। ছবি: সংগৃহীত।
বলিউড অভিনেতা ধর্মেন্দ্র ৮৯ বছর বয়সে মুম্বাইয়ে মারা গেছেন। তার মৃত্যুতে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী শোক প্রকাশ করে বলেছেন, অভিনেতা ধর্মেন্দ্রর মৃত্যুর মাধ্যমে ভারতীয় চলচ্চিত্রের 'একটি যুগের সমাপ্তি ঘটেছে'।
ধর্মেন্দ্র, যিনি প্রায়শই নিজেকে 'খুব সাধারণ মানুষ' বলে বর্ণনা করতেন, তিনি মানুষের বিরল ভালােবাসা পেয়েছেন এবং লাখ লাখ অন্ধ ভক্ত ছিল তাঁর।
অর্ধশতক আগে তার করা ১৯৭৫ সালের ব্লকবাস্টার 'শোলে' সিনেমার এক প্রেমময় পাতি সন্ত্রাসী বীরুর নামেই তিনি ছিলেন সর্বাধিক পরিচিত, রিপোর্ট বিবিসি নিউজ বাংলার।
তিনি ৩০০ টিরও বেশি ছবিতে অভিনয় করেছেন, বহু হিট সিনেমা দিয়ে দশকের পর দশক ধরে দর্শকদের মনে রাজত্ব করেছেন।
তার সিনেমার অনেক গান লােকের মুখে মুখে ফিরেছে, তুমুল জনপ্রিয় নায়িকা হেমা মালিনীর সাথে তার প্রেম এবং বিয়ে খবরের শিরোনাম হয়েছে।
তাকে বলা হত 'বলিউডের আসল হি-ম্যান' এবং 'গরম (হট) ধরম', জীবদ্দশায় কয়েকবারই তিনি বিশ্বের সবচাইতে 'সুদর্শন পুরুষে'র তালিকায় স্থান পেয়েছেন। বলা হত যে নারী ভক্তরা তার ছবি বালিশের নীচে রেখে ঘুমাতেন।
তার সৌন্দর্যের আকর্ষণ থেকে মুক্ত ছিলেন না বলিউড তারকারাও। অভিনেত্রী মাধুরী দীক্ষিত তাকে পর্দায় দেখা 'সবচেয়ে সুদর্শন পুরুষদের একজন' হিসাবে বর্ণনা করেন, সুপারস্টার সালমান খান বলেছেন ধর্মেন্দ্র ছিলেন 'সবচেয়ে সুন্দর চেহারার পুরুষ', আর অভিনেত্রী জয়া বচ্চন তাকে 'গ্রীক দেবতা' বলে অভিহিত করেন।
ধর্মেন্দ্র সবসময় বলতেন যে তার সুন্দর চেহারা নিয়ে আলোচনায় তিনি সবর্দাই 'বিব্রত' হতেন, আর তার সৌন্দর্যের পেছনে তিনি 'প্রকৃতি, নিজের বাবা-মা এবং নিজের জিন'কে কৃতিত্ব দিতেন।

পাঞ্জাবের লুধিয়ানা জেলার নাসরালি গ্রামে এক মধ্যবিত্ত জাট-শিখ পরিবারে ১৯৩৫ সালের আটই ডিসেম্বর জন্মগ্রহণ করেন তিনি, তার স্কুল শিক্ষক বাবা তার নাম রেখেছিলেন ধরম সিং দেওল।
২০০৮ সালে বিবিসি হিন্দির সাথে এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, তার বাবা চেয়েছিলেন তিনি পড়াশুনা চালিয়ে যান, কিন্তু খুব অল্প বয়সেই সিনেমার প্রেমে পড়েন তিনি, তখনই নায়ক হওয়ার স্বপ্ন দেখতেন।
"ক্লাশ নাইনে থাকতে প্রথম সিনেমা দেখি আমি, আর তখনই যেন আটকে যাই। আমি ভাবতাম, এত সুন্দর সুন্দর মানুষেরা যেখানে থাকে সেই স্বর্গ কােথায়? আমি ভাবতাম আমাকে ওখানে যেতেই হবে। আমার মনে হত, ওরা যেন আমার চেনা, এবং আমি ওদেরই লােক।"
কিন্তু বাড়িতে যখন নিজের ইচ্ছার কথা বললেন, তারা ভয় পেয়ে গিয়েছিলেন।
"আমার মা বললেন, 'তুমি আমাদের বড় সন্তান, পারিবারে তোমার দায়িত্ব আছে'। আমি খুব দুঃখ পেয়েছিলাম। পরে যখন ফিল্মফেয়ার ম্যাগাজিনের অল ইন্ডিয়া ট্যালেন্ট কনটেস্টের কথা শুনলাম, মা তখন মজা করার জন্য আমাকে বললেন, 'ঠিক আছে, তুমি আবেদনপত্র পাঠাও'। আমরা ভাবিনি যে আমি নির্বাচিত হব।"
কিন্তু তারপর সে প্রতিযোগিতায় জিতে তিনি বোম্বে (এখন মুম্বাই) চলে যান, পরের ঘটনা তাে ইতিহাস।
১৯৬০ সালে দিল ভি তেরা, হাম ভি তেরে সিনেমা দিয়ে আত্মপ্রকাশ করার পরের তিন দশক ধরে তিনি বলিউডে রাজত্ব করেছেন, ফি বছরে কয়েকটি করে হিট সিনেমা উপহার দিয়ে গেছেন।
১৯৬৩ সালে বিমল রায়ের সিনেমা 'বন্দিনি' দিয়ে ধর্মেন্দ্র প্রথম খ্যাতি পান, যেখানে একজন জেল ডাক্তারের চরিত্রে অভিনয় করেন তিনি, যিনি একজন আসামির প্রেমে পড়েন।
দ্রুতই তিনি একজন রোমান্টিক নায়ক হয়ে ওঠেন, সেই সময়কার শীর্ষ অভিনেত্রী নূতন, মীনা কুমারী, মালা সিনহা এবং সায়রা বানুর সাথে জুটি বেঁধে একের পর এক সিনেমায় অভিনয় করতে থাকেন।
১৯৬৬ সালে, তিনি ফুল অউর পাথর ছবিতে প্রথম অ্যাকশন চরিত্রে অভিনয় করেন, কিন্তু ১৯৭১ সালের হিট ছবি মেরা গাও মেরা দেশ তাকে অ্যাকশন হিরো হিসেবে খ্যাতি এনে দেয়।
দীর্ঘদেহী এবং সুগঠিত শরীরে ধর্মেন্দ্র প্রায়শই নিজের অ্যাকশন দৃশ্যে স্টান্ট ছাড়াই অভিনয় করতেন, এমনকি ঝুঁকিও নিতেন।
রোমান্স এবং অ্যাকশনের পাশাপাশি, এই অভিনেতা সাসপেন্স থ্রিলার এবং কমেডি হিট সিনেমাতেও সফল ছিলেন।
সেই সাথে ১৯৭৫ সালের হাসির সিনেমা চুপকে চুপকেতে তার 'অনবদ্য কমিক অভিনয়ে'র জন্য সমালোচকদের প্রশংসা কুড়িয়েছিলেন।
দীর্ঘ ক্যারিয়ারে ধর্মেন্দ্র ৭০ জন নায়িকার বিপরীতে অভিনয় করেছেন, কিন্তু পর্দায় তার সবচেয়ে সফল জুটি ছিল হেমা মালিনীর সাথে, যিনি পরে তার দ্বিতীয় স্ত্রী হন।
১৯৬৫ সালে এক সিনেমার প্রিমিয়ারে এই দম্পতির প্রথম দেখা হয় এবং হেমা মালিনীর সৌন্দর্যে তাৎক্ষণিকভাবেই বিমোহিত হয়েছিলেন ধর্মেন্দ্র।
২০১৭ সালের নিজের জীবনীতে, হেমা মালিনী লিখেছেন যে তিনি ধর্মেন্দ্রকে পাঞ্জাবি ভাষায় সহ অভিনেতা শশী কাপুরকে বলতে শুনেছেন, "কুড়ি বড়ি চাঙ্গি হ্যায় (মেয়েটি বেশ সুন্দর)"।
১৯৭০-এর দশকে সীতা আউর গীতা, রাজা জানি এবং শোলে-এর মতো সুপারহিট সিনেমায় একসঙ্গে অভিনয় করতে গিয়ে তাদের মধ্যে প্রেমের সম্পর্কের শুরু, যা সেসময় খবরের শিরোনামে উঠে আসে।
কারণ ধর্মেন্দ্র তখন বিবাহিত ছিলেন এবং তার প্রথম স্ত্রী প্রকাশ কাউরের প্রাপ্তবয়স্ক সন্তান রয়েছে।
ফলে হেমা মালিনীর পরিবার থেকে তাদের বিয়ের ব্যাপারে বিরোধিতা এসেছিল বলে মিডিয়ায় খবর প্রকাশ হয়েছিল।
কিন্তু শেষ পর্যন্ত ১৯৮০ সালে এই দম্পতি বিয়ে করেন।
সেসময়কার কিছু প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল যে তারা ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছিলেন, যেহেতু ইসলাম ধর্মে একাধিক বিয়ের অনুমতি রয়েছে, কিন্তু ধর্মেন্দ্র পরে ওই দাবি অস্বীকার করেছিলেন।
পরবর্তীতে এই অভিনেতা-প্রযোজক রাজনীতিতেও জড়িয়ে পড়েন।
২০০৫ থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত তিনি এক মেয়াদে রাজস্থানের বিকানের থেকে বিজেপির সাংসদ ছিলেন।
কিন্তু রাজনীতিকে গুরুত্বের সাথে না নেওয়ার জন্য তিনি সমালোচিত হন, কারণ তিনি খুব কমই সংসদ অধিবেশনে যোগ দিতেন, তার বদলে চলচ্চিত্রের শুটিং বা নিজের খামারে কাজ করতে পছন্দ করতেন ধর্মেন্দ্র।
কয়েক বছর পর, টেলিভিশন অনুষ্ঠান 'আপ কি আদালত' - এ কথা বলতে গিয়ে তিনি একমত হন যে রাজনীতিতে তিনি ঠিক যোগ্য মানুষ ছিলেন না।
"রাজনীতি আবেগপ্রবণ মানুষের জন্য নয়, এটা মোটা চামড়ার লোকদের জন্য," তিনি ওই অনুষ্ঠানে বলেছিলেন।
"ওই পাঁচ বছর আমার জন্য খুব কঠিন ছিল, খুব কঠিন ছিল।"
তিনি জীবনের প্রায় শেষ পর্যন্ত কাজ করেছেন, তার ছেলে সানি এবং ববি দেওলের সাথে অভিনয় করেছেন, রিয়েলিটি শো বিচারক হয়েছেন এবং সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে ভক্তদের সাথে যোগাযোগ রক্ষা করতেন তিনি।
জীবদ্দশায়, এই অভিনেতা মনে রাখার মত বহু চরিত্রে অভিনয় করেছেন, কিন্তু যদি একটি চরিত্র থাকে যার জন্য তিনি স্মরণীয় থাকবেন, সেটি হচ্ছে শোলে সিনেমায় বীরুর চরিত্র, ১৯৭৫ সালের ব্লকবাস্টার সিনেমা যা ভারতের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে একটি অবিস্মরণীয় ঘটনা হয়ে উঠেছে।
অমিতাভ বচ্চন, হেমা মালিনী এবং জয়া বচ্চন অভিনীত ওই চলচ্চিত্রে ধর্মেন্দ্র এবং অমিতাভ বচ্চন দুই মােহনীয় দুর্বৃত্তের চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন, যারা এক ভয়ানক দস্যুর বিরুদ্ধে লড়াই করে সকলের ত্রাণকর্তায় পরিণত হন।
কালক্রমে ছবিটি একটি কাল্ট ক্লাসিক হয়ে ওঠে এবং তার বহু ভক্ত ধর্মেন্দ্রকেই এই সিনেমার সাফল্যের জন্য কৃতিত্ব দেন, তাকে শোলে সিনেমার 'আত্মা' বলে বর্ণনা করেন।
অভিনেতা এ চরিত্রটিকে নিজের সেরা চরিত্র হিসেবে বর্ণনা করেন।
"আমার মনে হয় না আমি বীরুর চেয়ে ভালো চরিত্রে কখনও অভিনয় করেছি," তিনি বলেছিলেন।
কিন্তু কয়েক ডজন হিট ছবি উপহার দেওয়ার পরেও, ধর্মেন্দ্র কখনও বলিউডের 'এক নম্বর' নায়কের তকমা পাননি।
বরাবর তিনি দিলীপ কুমার, রাজেশ খান্না, অমিতাভ বচ্চনের মতো সমসাময়িক নায়কদের কাছে হেরে যেতেন এবং বেশ কয়েকবার মর্যাদাপূর্ণ ফিল্মফেয়ার পুরস্কারও তার হাতে না উঠে এই নায়কদের হাতেউঠেছে।
অবশেষে ১৯৯৭ সালে ফিল্মফেয়ার তাকে হিন্দি সিনেমায় অবদানের জন্য আজীবন সম্মাননা পুরস্কারে ভূষিত করে এবং ২০১২ সালে তাকে পদ্মভূষণে ভূষিত করা হয় - এটি ভারত সরকারের সম্মান যা বিশেষ অবদানের জন্য বেসামরিক নাগরিকদের দেওয়া হয়।
কিন্তু ধর্মেন্দ্র তার তারকাখ্যাতি হালকাভাবে গ্রহণ করেছিলেন, তারকাদের ইঁদুরের দৌড় থেকে তিনি দূরে থেকে বলেছিলেন যে তিনি 'কখনও ইন্ডাস্ট্রিতে এক নম্বর হতে চাননি'।
"আমি কখনও খুব বেশি টাকা চাইনি, এবং খ্যাতি ক্ষণস্থায়ী। আমি কেবল মানুষের ভালোবাসা চেয়েছিলাম," তিনি একজন সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন।
"আমি এখানে এসেছি কেবল এই ভালোবাসার জন্য। সবাই ধর্মেন্দ্রকে ভালোবাসে এবং আমি এর জন্য কৃতজ্ঞ," তিনি আরও বলেন।
তার মৃত্যুর খবরে সোশ্যাল মিডিয়ায় চলচ্চিত্র জগতের অনেকে শ্রদ্ধাঞ্জলি জানিয়েছেন।
অভিনেতা অক্ষয় কুমার লিখেছেন, "ধর্মেন্দ্র ছিলেন সেই নায়ক, প্রতিটি ছেলে বড় হয়ে তার মত হতে চাইত"
"প্রজন্মের পর প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ। আপনার সিনেমা এবং যে ভালােবাসা ছড়িয়ে দিয়েছেন আপনি - তার মধ্যেইআপনি বেঁচে থাকবেন।"
তার মৃত্যুকে "একটি যুগের সমাপ্তি" হিসেবে বর্ণনা করে পরিচালক করণ জোহর বলেছেন, "এ মৃ্ত্যু ইন্ডাস্ট্রিতে একটি শূন্যস্থান তৈরি করেছে... এমন একটি স্থান যা কেউ কখনও পূরণ করতে পারবে না... তিনি একজনই এবং একমাত্র ধর্মেন্দ্র থাকবেন"।