শিরোনাম
দৈনিক কালের কণ্ঠের সৌজন্যে
প্রকাশ: ১২:২৬, ২২ জানুয়ারি ২০২৬
ছবি: কালের কণ্ঠের সৌজন্যে।
বাংলাদেশি চলচ্চিত্রের সোনালি দিনের কিংবদন্তি নায়ক ইলিয়াস জাভেদ বুধবার তাঁর শেষযাত্রায় বিএফডিসিতে এলেন—যে প্রাঙ্গণে একসময় অসংখ্যবার প্রাণের স্পন্দন ছড়িয়ে দিয়েছিলেন। তবে এবার আর ফেরা হলো না; এটি ছিল তাঁর জীবনের শেষ এফডিসি-আসা।
বিকেলে এফডিসিতে জাভেদের মরদেহে শেষ শ্রদ্ধা জানাতে উপস্থিত হন চলচ্চিত্রাঙ্গনের অসংখ্য শিল্পী, পরিচালক, প্রযোজক ও ভক্তরা। তাঁদের মধ্যে ছিলেন বরেণ্য অভিনেতা আলমগীর, নায়ক উজ্জ্বল, পরিচালক দেওয়ান নজরুল, দেলোয়ার জাহান ঝন্টু, শিল্পী সমিতির সভাপতি মিশা সওদাগর, ওমর সানী, প্রযোজক খোরশেদ আলম খসরু, নৃত্যপরিচালক আজিজ রেজা, জয় চৌধুরী, মুক্তিসহ আরও অনেকে।
এফডিসির মসজিদের পাশে রাখা হয় জাভেদের মরদেহ। সেখানে দাঁড়িয়ে শোক প্রকাশ করেন তাঁর সহকর্মী অভিনেতা-অভিনেত্রী ও নির্মাতারা। আসরের নামাজের পর অনুষ্ঠিত হয় জানাজা। ভালোবাসা ও শ্রদ্ধায় সিক্ত হয়ে শেষবারের মতো বিদায় জানানো হয় এই কিংবদন্তি শিল্পীকে।
বিকেল ৫টার দিকে এফডিসি থেকে জাভেদের মরদেহ উত্তরার উদ্দেশে রওনা হয়। দ্বিতীয় জানাজা শেষে বাদ মাগরিব সন্ধ্যা ৬টা ৩৫ মিনিটে উত্তরার ১২ নম্বর সেক্টরের কবরস্থানে তাঁর লাশ দাফন করা হয়।
এর আগে বুধবার সকাল সোয়া ১১টায় উত্তরার নিজ বাসায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন ইলিয়াস জাভেদ। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৮২ বছর।
১৯৬৪ সালে উর্দু চলচ্চিত্র ‘নয়া জিন্দেগি’ দিয়ে নায়ক হিসেবে চলচ্চিত্রে অভিষেক ঘটে জাভেদের। তবে ১৯৬৬ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘পায়েল’ সিনেমাই তাঁকে এনে দেয় ব্যাপক দর্শকপ্রিয়তা। ওই ছবিতে তাঁর নায়িকা ছিলেন শাবানা।
দীর্ঘ ক্যারিয়ারে জাভেদ উপহার দিয়েছেন অসংখ্য জনপ্রিয় চলচ্চিত্র। তাঁর উল্লেখযোগ্য কাজের মধ্যে রয়েছে ‘মালেকা বানু’, ‘নিশান’, ‘পাপী শত্রু’, ‘রক্ত শপথ’, ‘সাহেব বিবি গোলাম’, ‘কাজল রেখা’, ‘অনেক দিন আগে’, ‘আজও ভুলিনি’, ‘কঠোর’, ‘মা বাবা সন্তান’, ‘রাখাল রাজা’, ‘রসের বাইদানী’, ‘জীবন সঙ্গী’, ‘আবদুল্লাহ’সহ আরো বহু চলচ্চিত্র।
ইলিয়াস জাভেদের প্রয়াণে বাংলা চলচ্চিত্র হারাল এক উজ্জ্বল অধ্যায়—যার নাচ, অভিনয় ও উপস্থিতি আজও দর্শকের স্মৃতিতে অম্লান।
স্বাধীনতার পর বাংলাদেশেই থেকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন তিনি
ঢালিউডের সোনালি দিনের কিংবদন্তি নায়ক ও নৃত্যশিল্পী ইলিয়াস জাভেদকে শেষ বিদায় জানাতে বুধবার বিকেলে এফডিসিতে জড়ো হন চলচ্চিত্র অঙ্গনের মানুষজন। জানাজা ও শ্রদ্ধা নিবেদন পর্বে উপস্থিত ছিলেন নব্বই দশকের জনপ্রিয় চিত্রনায়ক ওমর সানী।
সেখানেই আবেগভরে তিনি বলেন, ‘আমাদের যদি স্টার বলা হয়, তাহলে ইলিয়াস জাভেদ ছিলেন স্টারদের স্টার।’
ইলিয়াস জাভেদের প্রতি নিজের গভীর শ্রদ্ধা জানাতে গিয়ে ওমর সানী তার জীবদ্দশায় আজীবন সম্মাননা না পাওয়ার বিষয়টি নিয়ে আক্ষেপ প্রকাশ করেন।
তিনি বলেন, ‘জাভেদ সাহেব আমাদের সবার আইকন ছিলেন। আমার বিশ্বাস, জীবদ্দশায় তার লাইফটাইম অ্যাচিভমেন্ট পাওয়া উচিত ছিল। এই ব্যর্থতার দায় আমাদের সবার।’
ব্যক্তিগত জীবনে খুব কাছ থেকে ইলিয়াস জাভেদকে দেখার সৌভাগ্য হয়েছিল ওমর সানীর। নিজের কয়েকটি চলচ্চিত্রে জাভেদের সঙ্গে কাজ করার অভিজ্ঞতার কথাও তুলে ধরেন তিনি।
স্মৃতিচারণা করতে গিয়ে সানী বলেন, “একটি সিনেমায় তিনি আমার কোরিওগ্রাফার ছিলেন। একদিন আমি তাকে ‘ভাই’ বলে ডাকলে তিনি আমাকে বলেছিলেন, ‘না, তুমি আমাকে বাবা বলবা।’ সেই দিন থেকেই দেখা হলেই বলতাম—‘বাবা, কেমন আছেন?’ এই ছিল আমাদের সম্পর্ক।”
শেষ কয়েক বছরে নিয়মিত যোগাযোগ না থাকলেও ইলিয়াস জাভেদের খোঁজ রাখতেন বলেও জানান ওমর সানী। পাশাপাশি তিনি আলাদাভাবে উল্লেখ করেন প্রয়াত শিল্পীর স্ত্রী ডলি চৌধুরীর অবদান।
সানীর ভাষায়, ‘ডলি আপা নিজেও গ্ল্যামার নিয়ে চলচ্চিত্রে এসেছিলেন। কিন্তু জাভেদ সাহেবকে বিয়ে করে ৪২ বছর সংসার করেছেন। শেষ ১৮ বছর তিনি অসুস্থ ছিলেন।
এই দীর্ঘ সময় একজন শিশুর মতো করে তাকে আগলে রেখেছেন। ডলি আপা বলছিলেন, জাভেদ সাহেব প্রার্থনা করতেন—যেন তার কষ্ট না হয়, সৃষ্টিকর্তা যেন তাকে দ্রুত নিয়ে যান।’
১৯৬৪ সালে উর্দু চলচ্চিত্র ‘নয়া জিন্দেগি’ দিয়ে নায়ক হিসেবে চলচ্চিত্রজগতে যাত্রা শুরু করেন ইলিয়াস জাভেদ। তবে ১৯৬৬ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘পায়েল’ সিনেমাই তাঁকে এনে দেয় তারকাখ্যাতি। এরপর একের পর এক সফল সিনেমায় অভিনয়ের মাধ্যমে তিনি নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন বাংলা চলচ্চিত্রের অন্যতম জনপ্রিয় নায়ক ও নৃত্যশিল্পী হিসেবে।
সত্তর ও আশির দশকে ইলিয়াস জাভেদ মানেই ছিল দুর্দান্ত নাচ, শক্তিশালী অ্যাকশন আর পর্দাজুড়ে দুর্নিবার উপস্থিতি। দীর্ঘদিন ক্যানসারের সঙ্গে লড়াই করে ঢালিউডের এই কিংবদন্তি শিল্পী বুধবার (২১ জানুয়ারি) শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন। তাঁর প্রয়াণে বাংলা চলচ্চিত্র হারাল এক উজ্জ্বল অধ্যায়, যা দর্শকের স্মৃতিতে চিরকাল অম্লান হয়ে থাকবে।