শিরোনাম
ডেস্ক রিপোর্ট
প্রকাশ: ০৯:৪৫, ৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | আপডেট: ০৯:৪৬, ৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
অনুতিন চার্নভিরাকুল রোববারের থাই নির্বাচনে জয়লাভ করতে যাচ্ছেন। ছবি: সংগৃহীত।।
থাইল্যান্ডের রক্ষণশীল প্রধানমন্ত্রী জাতীয়তাবাদের জোয়ারে চড়ে রবিবারের সাধারণ নির্বাচনে জয়লাভ করেছেন এবং প্রত্যাশার চেয়েও ভালো ফলাফল করেছেন।
ব্যাংককে তার দলের সদর দপ্তরে সাংবাদিকদের অনুতিন চার্নভিরাকুল বলেন, নির্বাচনে আমরা সম্ভবত প্রথম স্থান অধিকার করতে যাচ্ছি। আজকের এই জয় সকল থাই জনগণের, আপনি আমাদের ভোট দিয়েছেন কি দেননি সেটা বড় কথা নয়।
থাইল্যান্ডের চ্যানেল ৩-এর পূর্বাভাস অনুযায়ী, অনুতিনের (ভুমজাইথাই) দল প্রায় ২০০টি আসন পেতে যাচ্ছে। অন্যদিকে প্রগতিশীল পিপলস পার্টি ১০০টির কিছু বেশি আসন পেয়ে বেশ পিছিয়ে রয়েছে এবং কারাবন্দী সাবেক প্রধানমন্ত্রী থাকসিন সিনাওয়াত্রার ফেউ থাই পার্টি তৃতীয় অবস্থানে আছে, খবর ডেইলী সাবাহ’র।
অনুতিনের জন্য এটি একটি চমকপ্রদ মোড়। গত নির্বাচনে তার দল তৃতীয় হয়েছিল এবং ফেউ থাই পার্টির দুইজন প্রধানমন্ত্রী আদালত কর্তৃক অপসারিত হওয়ার পর গত সেপ্টেম্বরে সংসদ তাকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ দেয়।
পরাজয় স্বীকার করে পিপলস পার্টির নেতা নাথফং রুয়েংপানিয়াউত ব্যাংককে সাংবাদিকদের বলেন, আমরা প্রথম স্থান অধিকারী দলকে সম্মান জানানো এবং তাদের সরকার গঠনের অধিকারের নীতিতে অটল আছি।
অনেক ভোটারের মনেই কম্বোডিয়ার সাথে দীর্ঘদিনের সীমান্ত বিরোধের বিষয়টি প্রাধান্য পেয়েছে, যা গত বছর দুইবার প্রাণঘাতী সংঘর্ষে রূপ নিয়েছিল। অনুতিনের নিজ শহর বুরিরামের ৬৪ বছর বয়সী ভোটার ইউর্নিয়ং লুনবুট বলেন, আমাদের একজন শক্তিশালী নেতা দরকার যিনি আমাদের সার্বভৌমত্ব রক্ষা করতে পারবেন। এখানে বসবাস করায় সীমান্ত সংঘাত আমাকে উদ্বিগ্ন করে তুলেছে। যুদ্ধ এমন কিছু ছিল যা নিয়ে আমরা আগে কখনও ভাবিনি।
দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই অনুতিন সরকারকে না জানিয়ে সীমান্ত এলাকায় সশস্ত্র বাহিনীকে যেকোনো ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষমতা প্রদান করেন। গত ডিসেম্বরের সর্বশেষ লড়াইয়ে থাইল্যান্ডের সেনাবাহিনী কিছু বিতর্কিত এলাকার নিয়ন্ত্রণ নেয় এবং বর্তমানে সেখানে যুদ্ধবিরতি চলছে।
নির্মাণ শিল্পের উত্তরাধিকারী এবং শখের জেট পাইলট অনুতিন, যিনি গাঁজা বৈধ করার পক্ষে প্রচার চালিয়েছিলেন, তিনি বলেন, ভুমজাইথাই পার্টির প্রত্যেকের হৃদয়ে জাতীয়তাবাদ রয়েছে। তিনি তার দলের নীল রঙ এবং থাই জাতীয় পতাকার রঙের মিলের দিকে ইঙ্গিত করে এই মন্তব্য করেন।
থাইল্যান্ডের উবন রাতচাথানি বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনৈতিক বিশ্লেষক তিতিপোল ফাকদিওয়ানিচ এএফপি-কে (AFP) জানিয়েছেন যে, জাতীয়তাবাদকে পুঁজি করে ভুমজাইথাই দল নির্বাচনে প্রত্যাশার চেয়েও অনেক বেশি সাফল্য পেয়েছে।
তিনি বলেন, "তারা নিজেদের সেনাবাহিনী এবং রাজতন্ত্রের সমর্থক হিসেবে উপস্থাপন করেছে। তারা 'থাই পরিচয়' বা 'থাইনেস'-এর এমন এক ধারণা তুলে ধরেছে যা ভোটারদের ওপর ব্যাপক প্রভাব ফেলেছে।"
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার এই দেশটির পরবর্তী সরকারকে মন্থর অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে। থাইল্যান্ডের জন্য পর্যটন খাত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হলেও পর্যটকদের সংখ্যা এখনো কোভিড-পূর্ববর্তী অবস্থায় ফিরে আসেনি। এছাড়া প্রতিবেশী দেশগুলো থেকে পরিচালিত মাল্টি-বিলিয়ন ডলারের আন্তঃদেশীয় সাইবার ক্রাইম নেটওয়ার্ক দমন করাও হবে নতুন সরকারের জন্য একটি বড় কাজ।
আগাম মুক্তি?
ভুমজাইথাই দল ৫০০ আসনের নিম্নকক্ষে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পেলেও, তাদের প্রাপ্ত আসন সংখ্যা জোট গঠনের আলোচনায় তাদের সুবিধাজনক অবস্থানে রাখবে। থাইল্যান্ডে একটি মিশ্র প্রতিনিধিত্ব ব্যবস্থা অনুসরণ করা হয়, যেখানে ৪০০ জন সংসদ সদস্য (MP) সরাসরি ভোটে নির্বাচিত হন এবং ১০০টি আসন আলাদা ব্যালটের মাধ্যমে দলীয় তালিকার ভিত্তিতে বরাদ্দ করা হয়।
পিপলস পার্টির পূর্বসূরি 'মুভ ফরোয়ার্ড' তিন বছর আগের নির্বাচনে সবচেয়ে বেশি আসন জিতেছিল। কিন্তু তাদের প্রার্থীকে প্রধানমন্ত্রীর পদে বসতে বাধা দেওয়া হয়েছিল এবং পরবর্তীতে দলটি বিলুপ্ত ঘোষণা করা হয়।
ভুমজাইথাই যেখানে জাতীয় প্রতিরক্ষা—বিশেষ করে গত বছরের কম্বোডিয়ার সাথে সংঘর্ষের ওপর জোর দিয়েছে, সেখানে পিপলস পার্টি বাধ্যতামূলক সামরিক সেবা বন্ধ এবং জেনারেলদের সংখ্যা কমানোর পক্ষে কথা বলেছে।
অনুতিনের জন্য ফেউ থাই একটি সম্ভাব্য জোট সঙ্গী হতে পারে। তারা আগে মিত্র ছিল, কিন্তু তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী পেতংতার্ন সিনাওয়াত্রা (থাকসিনের মেয়ে) যেভাবে কম্বোডিয়ার সাথে সীমান্ত বিরোধ সামলেছিলেন, তা নিয়ে ভুমজাইথাই অসন্তুষ্ট হয়ে জোট থেকে বেরিয়ে গিয়েছিল। পেতংতার্ন একটি ফাঁস হওয়া ফোন কলে কম্বোডিয়ার প্রভাবশালী নেতা হুন সেনকে "চাচা" বলে সম্বোধন করেছিলেন এবং থাই সামরিক কমান্ডারকে তার "প্রতিপক্ষ" হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন।
দুর্নীতির অভিযোগে থাকসিন বর্তমানে এক বছরের কারাদণ্ড ভোগ করছেন। তবে অনেক পর্যবেক্ষকের ধারণা, রাজনৈতিক সমঝোতার অংশ হিসেবে তাকে নির্ধারিত সময়ের আগেই মুক্তি দেওয়া হতে পারে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ফেউ থাই থাইল্যান্ডের সবচেয়ে সফল রাজনৈতিক সংগঠন হিসেবে পরিচিত ছিল। থাকসিনের ভাগ্নে পরিবারের পঞ্চম প্রধানমন্ত্রী হওয়ার লড়াইয়ে থাকলেও দলটির জনপ্রিয়তা এখন আগের তুলনায় অনেক কমে গেছে।
প্রধান তিনটি রাজনৈতিক দলই বিভিন্ন ধরণের জনহিতকর অনুদান এবং আর্থ-সামাজিক নীতির প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। এর মধ্যে অর্থনীতিকে চাঙ্গা করতে ফেউ থাই প্রতিদিন নয়জনকে ১০ লক্ষ বাথ (৩১,০০০ ডলার) করে পুরস্কার দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল।
সংবিধান গণভোট
থাইল্যান্ডের রাজনৈতিক ইতিহাস সামরিক অভ্যুত্থান, রক্তক্ষয়ী রাজপথের আন্দোলন এবং আদালত কর্তৃক প্রধানমন্ত্রী ও রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ হওয়ার ঘটনায় পরিপূর্ণ।
২০১৪ সালের সর্বশেষ সামরিক অভ্যুত্থানের পর প্রণীত সংবিধানে সিনেট কর্তৃক নিযুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোকে ব্যাপক ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে, আর এই সিনেট সদস্যরা সরাসরি জনগণের ভোটে নির্বাচিত নন।