শিরোনাম
ডেস্ক রিপোর্ট
প্রকাশ: ১১:০৮, ২৮ জানুয়ারি ২০২৬
প্রতীকি ছবি: সংগৃহীত।
এক বছর আগে একটি আমেরিকান এয়ারলাইন্স জেট এবং একটি আর্মি ব্ল্যাক হক হেলিকপ্টারের সংঘর্ষে ৬৭ জনের মৃত্যু হয়েছিল।
ওয়াশিংটন ডিসির কাছে মাঝ আকাশে এক ভয়াবহ সংঘর্ষের ঘটনা নিয়ে তদন্তকারীরা জানিয়েছেন যে, দীর্ঘ কয়েক বছর ধরে ট্রাফিক সংক্রান্ত সতর্কতা উপেক্ষা করার ফলেই এই দুর্ঘটনা ঘটেছে। ন্যাশনাল ট্রান্সপোর্টেশন সেফটি বোর্ড (NTSB) মঙ্গলবার তাদের গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে, খবর এনবিসি নিউজের।
তদন্তে উঠে এসেছে যে, রেগান ন্যাশনাল এয়ারপোর্টের রানওয়ের অ্যাপ্রোচ পথে একটি হেলিকপ্টার রুট থাকা এবং সেটি নিয়মিত পর্যালোচনা না করা এই দুর্ঘটনার অন্যতম প্রধান কারণ। এছাড়া এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোলাররা পাইলটদের নিজেদের উদ্যোগে অন্য বিমান এড়িয়ে চলার যে পরামর্শ দিতেন, তার ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতাও বড় ভূমিকা রেখেছে। শুনানিতে তদন্তকারীরা বারবার উল্লেখ করেছেন যে, হেলিকপ্টার কর্তৃক ট্রাফিক সংক্রান্ত ঝুঁকিগুলো মোকাবিলা করার একাধিক সুযোগ হাতছাড়া করা হয়েছিল।
বোর্ডের সদস্য টড ইনম্যান উপস্থিত দর্শকদের উদ্দেশ্যে দুঃখ প্রকাশ করে বলেন, "আপনাদের পরিবারের সদস্যদের রক্তের বিনিময়ে এই রিপোর্টের পাতাগুলো লেখা হয়েছে। আমাদের আজ এখানে উপস্থিত হতে হয়েছে বলে আমি ক্ষমাপ্রার্থী।" শুনানিতে উপস্থিত ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্যরা অত্যন্ত শোকার্ত ছিলেন। ফ্লাইটের একটি অ্যানিমেশন ভিডিও দেখানোর সময় অনেককে কান্নায় ভেঙে পড়তে দেখা যায়। ক্রিস্টেন মিলার-জান নামে এক নারী জানান, অবহেলার কারণে তার ভাইসহ ৬৭ জন মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন, যা অত্যন্ত দুঃখজনক।
ন্যাশনাল ট্রান্সপোর্টেশন সেফটি বোর্ড-এর মতে, কোনো একক ব্যক্তির ভুলের চেয়ে একাধিক প্রতিষ্ঠানের "সিস্টেমিক বা পদ্ধতিগত সমস্যা" এই দুর্ঘটনার জন্য বেশি দায়ী। কানসাস থেকে আসা ওই বিমান এবং হেলিকপ্টারটির সংঘর্ষের পর সেগুলো বরফশীতল পটোম্যাক নদীতে আছড়ে পড়ে। এতে থাকা প্রত্যেকেই নিহত হন। ২০০১ সালের পর এটি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতে ঘটে যাওয়া সবচেয়ে ভয়াবহ বিমান দুর্ঘটনা।
তদন্তকারীরা জানান, ২০১৩ সালে একটি সম্ভাব্য সংঘর্ষ অল্পের জন্য এড়ানো গেলেও ফেডারেল এভিয়েশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (FAA) হেলিকপ্টার রুট পরিবর্তনের কোনো উদ্যোগ নেয়নি। এছাড়া পাইলটদের চার্টে হেলিকপ্টার রুট সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য যোগ করতেও তারা অস্বীকৃতি জানিয়েছিল। দীর্ঘদিনের লাল ফিতার দৌরাত্ম্য এবং আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে বারবার দেওয়া সুপারিশগুলো উপেক্ষা করা হয়েছে বলে তদন্তে উঠে এসেছে। তবে গত সপ্তাহেফেডারেল এভিয়েশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশন কিছু স্থায়ী পরিবর্তন এনেছে যাতে হেলিকপ্টার এবং বিমান একই আকাশসীমা ব্যবহার না করে।
মার্কিন পরিবহন দপ্তরের প্রাক্তন ইন্সপেক্টর জেনারেল মেরি শিয়াভো বলেন, ফেডারেল এভিয়েশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (FAA) কতবার ব্যবস্থা নিতে ব্যর্থ হয়েছে তা শোনা সত্যিই উদ্বেগজনক। তার মতে, এটি FAA-এর দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে একটি চরম অবহেলা এবং সংস্থাটি এই সমস্যাগুলো সমাধান করার সামর্থ্য রাখে কি না, তা নিয়ে তিনি সন্দেহ প্রকাশ করেন।
তবে গত সোমবারই পরিবহন সচিব শন ডাফিফেডারেল এভিয়েশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশন পুনর্গঠনের একটি পরিকল্পনা ঘোষণা করেছেন। এই পরিকল্পনার আওতায় একটি কেন্দ্রীয় সেফটি অফিস তৈরি করা হবে, যা পুরো সংস্থার নিরাপত্তা সংক্রান্ত উদ্বেগগুলো তদারকি করবে এবং বিচ্ছিন্নভাবে কাজ করার পরিবর্তে অভিন্ন মানদণ্ড নিশ্চিত করবে।
NTSB তদন্তকারীরা জানান যে, দুর্ঘটনার আগে সেনাবাহিনী এবং ফেডারেল এভিয়েশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশন একে অপরের সাথে নিরাপত্তার সব তথ্য আদান-প্রদান করেনি। এমনকি সেনাবাহিনীর হেলিকপ্টার পাইলটরা অনেক সময় জানতেনই না যে তারা রেগান বিমানবন্দরের আশেপাশে বড় কোনো দুর্ঘটনার ঝুঁকি বা 'নিয়ার-মিস' পরিস্থিতির মধ্যে পড়েছিলেন।
তদন্তকারী ক্যাথরিন উইলসন জানান, দুর্ঘটনার ১০-১৫ মিনিট আগে যখন বিমানের সংখ্যা বেড়ে ১০টিতে পৌঁছায়, তখন এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোলার কিছুটা চাপ অনুভব করেছিলেন। পরে দু-একটি হেলিকপ্টার চলে যাওয়ায় তিনি পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার মতো মনে করেন। কিন্তু সংঘর্ষের ঠিক ৯০ সেকেন্ড আগে বিমানের সংখ্যা সর্বোচ্চ ১২টিতে (৭টি প্লেন ও ৫টি হেলিকপ্টার) পৌঁছালে তার ওপর কাজের চাপ অনেক বেড়ে যায়। এর ফলে তিনি পরিস্থিতির ওপর সঠিক নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেন।
শুনানিতে একটি ভিডিও অ্যানিমেশনের মাধ্যমে দেখানো হয় যে, ওয়াশিংটনের আলোকসজ্জার মধ্যে উভয় যানের পাইলটদের জন্য একে অপরকে শনাক্ত করা কতটা কঠিন ছিল। এছাড়া বিমানের উইন্ডশিল্ড এবং হেলিকপ্টার ক্রুদের নাইট ভিশন গগলসও তাদের দৃষ্টিসীমাকে বাধাগ্রস্ত করেছিল।
ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্য রেচেল ফেরেজ জানান, তিনি এই তদন্ত প্রক্রিয়া থেকে স্বচ্ছতা এবং দ্রুত পদক্ষেপ আশা করছেন। তার মতে, আর কাউকে যেন এভাবে হঠাৎ করে তার পুরো পরিবার বা প্রিয়জনকে হারানোর খবর শুনতে না হয়।
সরকারকে এখন বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে হবে। কংগ্রেস, সেনাবাহিনী এবং ট্রাম্প প্রশাসন এই শুনানির পর কী পদক্ষেপ নেয়, তার ওপরই সব নির্ভর করছে। একটি নতুন বিল প্রস্তাব করা হয়েছে যেখানে বিমানে উন্নত 'লোকেটর সিস্টেম' থাকা বাধ্যতামূলক করার কথা বলা হয়েছে যাতে সংঘর্ষ এড়ানো যায়। ন্যাশনাল ট্রান্সপোর্টেশন সেফটি বোর্ড প্রধান জেনিফার হোমেন্ডি এই বিলটি সমর্থন করেছেন। তদন্তকারীরা আগেই জানিয়েছিলেন যে, রেগান বিমানবন্দরের কন্ট্রোলাররা পাইলটদের ওপর দৃষ্টির মাধ্যমে দূরত্ব বজায় রাখার যে দায়িত্ব দিয়েছিলেন, তা ছিল প্রয়োজনের তুলনায় অনেক বেশি ঝুঁকিপূর্ণ।
দুর্ঘটনার রাতে কন্ট্রোলার ব্ল্যাক হক হেলিকপ্টারের অনুরোধে দুইবার অনুমতি দিয়েছিলেন। তবে তদন্তে দেখা গেছে, আমেরিকান এয়ারলাইন্সের বিমানটি যখন অবতরণের জন্য ঘুরছিল, হেলিকপ্টার পাইলটরা সম্ভবত সেটিকে একেবারেই দেখতে পাননি।
এক বিবৃতিতে ফেডারেল এভিয়েশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশন জানিয়েছে যে, নিরাপত্তাই তাদের প্রধান অগ্রাধিকার। তারা রেগান বিমানবন্দরে প্রতি ঘণ্টায় বিমান অবতরণের সংখ্যা ৩৬ থেকে কমিয়ে ৩০-এ নামিয়ে এনেছে এবং টাওয়ারে কর্মী সংখ্যা বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে। সংস্থাটি জানায়, বর্তমানে টাওয়ারে ২২ জন সার্টিফাইড কন্ট্রোলার রয়েছেন এবং আরও ৮ জন প্রশিক্ষণাধীন আছেন।
এভিয়েশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশন আরও বলেছে যে, তারা ন্যাশনাল ট্রান্সপোর্টেশন সেফটি বোর্ড -এর দেওয়া অতিরিক্ত সুপারিশগুলো অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করবে।
ওয়াশিংটনের এই সংঘর্ষের পর আরও বেশ কিছু বড় দুর্ঘটনা এবং অল্পের জন্য বেঁচে যাওয়ার মতো ঘটনা জনমনে আতঙ্ক সৃষ্টি করেছিল। তবে NTSB-এর পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত বছর সারা দেশে মোট দুর্ঘটনার সংখ্যা ছিল ১,৪০৫টি, যা ২০২০ সালে করোনা মহামারি শুরু হওয়ার পর থেকে সর্বনিম্ন।