শিরোনাম
ডেস্ক রিপোর্ট
প্রকাশ: ২২:২৮, ২৮ জানুয়ারি ২০২৬
ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী স্যার কিয়ার স্টারমার বেইজিং-এ পৌঁছেছেন। ছবি: সংগৃহীত।
চীন সফর যুক্তরাজ্যের জন্য সুফল বয়ে আনবে বলে জোর দিয়ে জানিয়েছেন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী স্যার কিয়ার স্টারমার। দীর্ঘ আট বছর পর প্রথম ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তিনি তিন দিনের সফরে চীনে পৌঁছেছেন।
গত কয়েক বছরের তিক্ততা কাটিয়ে দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্যিক ও সাংস্কৃতিক সম্পর্ক জোরদার করাই স্টারমারের এই সফরের মূল লক্ষ্য। তবে চীনের কাছ থেকে যুক্তরাজ্যের জাতীয় নিরাপত্তার ঝুঁকি এবং শি জিনপিং সরকারের মানবাধিকার লঙ্ঘনের রেকর্ড নিয়ে দেশে বিরোধী দলগুলোর সমালোচনার মুখে পড়েছেন তিনি।
বৃহস্পতিবার প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে বৈঠক করবেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, এই সফর যুক্তরাজ্যের জন্য ইতিবাচক হবে এবং বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির দেশটির সঙ্গে একটি "কৌশলগত ও ধারাবাহিক সম্পর্ক" বজায় রাখা জরুরি, খবর বিবিসি’র।
বেইজিং বিমানবন্দরে পৌঁছালে চীন সরকারের একটি প্রতিনিধি দল তাকে ফুলের তোড়া দিয়ে স্বাগত জানায়। বেইজিংয়ের তিয়ানানমেন স্কয়ারে এ সময় যুক্তরাজ্যের ইউনিয়ন জ্যাক পতাকা উড়তে দেখা যায়।
সফরে তার সঙ্গে থাকা ৬০ জন ব্রিটিশ ব্যবসায়ী নেতার উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী বলেন, "এই প্রতিনিধি দলের মাধ্যমে আপনারা ইতিহাস গড়ছেন। আমরা যে পরিবর্তন আনছি, আপনারা তার অংশ। আমরা বাইরের বিশ্বের দিকে তাকাতে, সুযোগ গ্রহণ করতে এবং সম্পর্ক তৈরিতে বদ্ধপরিকর... এবং আমাদের মূল লক্ষ্য সবসময় জাতীয় স্বার্থ রক্ষা করা।"
একজন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর জন্য চীনের সঙ্গে রাজনৈতিক সম্পর্ক রক্ষা করা বেশ জটিল। উত্তর-পশ্চিম জিনজিয়াং অঞ্চলে উইঘুর এবং অন্যান্য মুসলিম জাতিগত গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ রয়েছে চীনের বিরুদ্ধে। এছাড়া হংকংয়ের গণতন্ত্রপন্থী মিডিয়া টাইকুন জিমি লাই-এর কারাদণ্ড নিয়েও সমালোচনা রয়েছে, যিনি যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের সম্মুখীন।
মানবাধিকারের পাশাপাশি যুক্তরাজ্যের অভ্যন্তরে চীনা গোয়েন্দা তৎপরতা নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। সম্প্রতি এমআইফাইভ (MI5) প্রধান সতর্ক করেছেন যে, চীনা সরকারি এজেন্টরা প্রতিদিন যুক্তরাজ্যের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
চীনা নেতাদের সঙ্গে কোন কোন সুনির্দিষ্ট বিষয়ে কথা বলবেন, তা এখনই খোলসা করতে রাজি হননি স্টারমার। সফররত সাংবাদিকদের তিনি বলেন, "অতীতের সব সফরেই আমি প্রয়োজনীয় বিষয়গুলো নিয়ে কথা বলেছি। তবে নির্দিষ্ট আলোচনার আগে আমি এ বিষয়ে আগাম কিছু বলতে চাই না।"
তিনি আরও যোগ করেন: "চিনের সাথে আলোচনার একটি বড় কারণ হলো যাতে আমাদের মধ্যকার দ্বিমতের বিষয়গুলো নিয়ে আলাপ করা যায় এবং ঐকমত্যের বিষয়গুলোকে এগিয়ে নেওয়া যায়। এটাই আমাদের কর্মপন্থা।"
স্যার কিয়ার আশা করছেন যে তার এই সফর—যা ২০১৮ সালে থেরেসা মে-র সফরের পর কোনো ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর প্রথম চিন সফর—চিনের সাথে সম্পর্ক পুনরুদ্ধার করবে, পাশাপাশি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকেও পাশে রাখবে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দুই পরাশক্তির মধ্যে বাড়তে থাকা বাণিজ্যিক উত্তজনা সত্ত্বেও তিনি জোর দিয়ে বলেছেন যে, যুক্তরাজ্যকে চীন এবং আমেরিকার মধ্যে কোনো একটিকে "বেছে নিতে" বাধ্য করা হবে না।
তিনি জানান, ব্যবসা, নিরাপত্তা এবং প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে যুক্তরাজ্যের সাথে আমেরিকার "ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক" বজায় থাকবে। তবে তিনি এও যোগ করেন যে, "মাথা নিচু করে চীনকে উপেক্ষা করা... বুদ্ধিমানের কাজ হবে না।"
লন্ডনে একটি বিতর্কিত চীনা মেগা-অ্যাম্বাসি বা বিশাল দূতাবাস তৈরির পরিকল্পনায় সরকার অনুমোদন দেওয়ার পর প্রধানমন্ত্রীর এই সফর দেশে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েছে।
কনজারভেটিভ দলের নেতা কেমি ব্যাডেনোক বলেছেন, তিনি প্রধানমন্ত্রী হলে "এই মুহূর্তে" চীন সফরে যেতেন না।
সাংবাদিকদের তিনি বলেন, "আমাদের উচিত সেই দেশগুলোর সাথে বেশি কথা বলা যারা আমাদের স্বার্থের সাথে সংগতিপূর্ণ, এমন কোনো দেশের সাথে নয় যারা আমাদের অর্থনীতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করার জন্য সবরকম চেষ্টা করছে।"
তিনি আরও বলেন, "আমার মনে হয় প্রধানমন্ত্রীর এই বিষয়গুলো নিয়েই কথা বলা উচিত এবং তাকে শক্ত অবস্থান দেখাতে হবে। এমন একটি সুপার-অ্যাম্বাসির অনুমোদন দেওয়া ঠিক হয়নি যা অনেকের মতে একটি স্পাই হাব বা গোয়েন্দা কেন্দ্রে পরিণত হতে যাচ্ছে।"
এর আগে তিনি বলেছিলেন যে স্টারমার চীন গিয়ে কী করবেন তা নিয়ে তিনি "উদ্বিগ্ন"। তিনি খোঁচা দিয়ে বলেন, "ফিরে আসার আগে তিনি হয়তো আইল অফ ওয়াইট-ও দিয়ে দেবেন। আমাদের এমন একটি বাস্তবসম্মত পররাষ্ট্রনীতি থাকা উচিত যা ব্রিটেনের জাতীয় স্বার্থের ওপর গুরুত্ব দেয়।"
হাউস অফ কমন্সে লিবারেল ডেমোক্র্যাটদের কাছ থেকেও সমালোচনার মুখে পড়েন স্যার কিয়ার। সেখানে সাপ্তাহিক প্রশ্নোত্তর পর্বে তার পরিবর্তে উপস্থিত ছিলেন উপ-প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ল্যামি।
লিবারেল ডেমোক্র্যাট দলের উপ-নেতা ডেইজি কুপার বলেন, "যেখানে চীনা সরকার এখনও ব্রিটিশ নাগরিক জিমি লাইকে বন্দি করে রেখেছে এবং যেখানে তারা ব্রিটেনের রাস্তায় গণতন্ত্রপন্থী বিক্ষোভকারীদের মাথার ওপর পুরস্কার ঘোষণা করে খুঁজে বেড়াচ্ছে, সেখানে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী একটি সুপার-অ্যাম্বাসির প্রতিশ্রুতি দিয়ে চিনের কাছে একটি বাণিজ্য চুক্তির জন্য হাত পাততে গিয়েছেন, যেখান থেকে চীনা সরকার আমাদের ওপর নজরদারি চালিয়ে যাবে।"