শিরোনাম
ডেস্ক রিপোর্ট
প্রকাশ: ১০:২৩, ৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | আপডেট: ১০:২৪, ৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
প্রতিনিধিত্বশীল ছবি: সংগৃহীত।
ইংল্যান্ডে গৃহহীন বা গৃহহীন হওয়ার ঝুঁকিতে থাকা শরণার্থী পরিবারের সংখ্যা গত চার বছরে পাঁচ গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০২১/২২ সালে এই সংখ্যা ছিল ৩,৫৬০, যা ২০২৪/২৫ সালে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৯,৩১০-এ, প্রতিবেদন করেছে বিবিসি।
বিভিন্ন দাতব্য সংস্থা এই পরিস্থিতির জন্য সরাসরি সরকারি নীতিকে দায়ী করেছে। তারা বিশেষ করে নতুন স্বীকৃতিপ্রাপ্ত শরণার্থীদের হোম অফিসের আবাসন (যেমন হোটেল) থেকে সরে যাওয়ার জন্য দেওয়া ২৮ দিনের সময়সীমা এবং আশ্রয়প্রার্থীদের আবেদনের দ্রুত নিষ্পত্তির বিষয়টিকে বড় কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে।
সরকার জানিয়েছে যে, তারা শরণার্থীদের আশ্রয়ের আবাসন থেকে নিজস্ব বাসস্থানে স্থানান্তরের ক্ষেত্রে সহায়তা করতে "প্রতিজ্ঞাবদ্ধ" এবং গৃহহীনতার ঝুঁকি কমাতে স্থানীয় কর্তৃপক্ষের সাথে কাজ করছে।
যুক্তরাজ্যের বিপর্যস্ত আশ্রয় ব্যবস্থা সামলাতে ধারাবাহিক সরকারগুলো হিমশিম খাচ্ছে, যেখানে অসংখ্য মানুষ তাদের আবেদনের সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় রয়েছে। আবেদনের প্রক্রিয়া ধীরগতির এবং এক পর্যায়ে এটি পুরোপুরি বন্ধ রাখা হয়েছিল। তবে বর্তমান লেবার সরকার দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে চায়, যার ফলে আরও বেশি মানুষ শরণার্থী মর্যাদা পাচ্ছেন এবং বসবাসের জন্য জায়গা খুঁজছেন।
গৃহহীন শরণার্থীদের সহায়তাকারী একটি সংস্থা জানিয়েছে যে, সাহায্যপ্রার্থীদের মধ্যে ৩০ বছরের কম বয়সী তরুণীদের সংখ্যাই বেশি।
সুদানের যুদ্ধ থেকে পালিয়ে ছোট নৌকায় করে যুক্তরাজ্যে আসা ২৬ বছর বয়সী ইউসরা তাদেরই একজন। তিনি জানান, যুক্তরাজ্যে আসার আগেই তার পরিবারের সবাই নিহত হয়েছে। প্রায় পাঁচ মাস সরকারি হোটেলে থাকার পর আগস্টের শেষের দিকে যখন তিনি শরণার্থী মর্যাদা পান, তখন থেকেই গ্রেটার ম্যানচেস্টারের রাস্তায় তাঁবুতে রাত কাটাচ্ছেন তিনি।
ইউসরা বলেন, "মাঝে মাঝে মাতাল লোকজন এসে তাঁবু খোলার চেষ্টা করে এবং আমি চিৎকার শুরু করি। সকাল না হওয়া পর্যন্ত আমি ঘুমাতে পারি না।"
হোম অফিসের আবাসন ছাড়ার কয়েক দিন আগে ইউসরা স্থানীয় কাউন্সিলের সাথে যোগাযোগ করেছিলেন। কিন্তু সন্তানহীন একজন একা প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ায় সামাজিক আবাসনের ক্ষেত্রে তাকে কম অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। উন্নত জীবনের আশায় সুদান থেকে পালিয়ে আসলেও, গৃহহীন হওয়ার পর এখন ইউসরা যুক্তরাজ্যে আসার সিদ্ধান্ত নিয়ে অনুশোচনা করছেন। তার ভাষ্যমতে, গৃহহীন হওয়ার পর জীবন এখন "খুবই কঠিন" হয়ে পড়েছে।
স্টকপোর্ট রেস ইকুয়ালিটি পার্টনারশিপ থেকে সহায়তা পাওয়া অনেক শরণার্থীর মধ্যে তিনি একজন। একজন আশ্রয়প্রার্থী যখন শরণার্থী মর্যাদা পান, তখন সরকারি অর্থায়নে পরিচালিত আবাসন (সাধারণত এইচএমও বা হোটেল) ছেড়ে নিজের থাকার ব্যবস্থা করার জন্য তারা মাত্র ২৮ দিন সময় পান। একই সময়ে, তাদের কাজ খুঁজে নিতে হয় অথবা প্রয়োজনবোধে 'ইউনিভার্সাল ক্রেডিট'-এর জন্য আবেদন করতে হয়।
সরকার জানিয়েছে যে, প্রথম ইউনিভার্সাল ক্রেডিট পেমেন্ট পেতে সাধারণত প্রায় ৩৫ দিন সময় লাগে। ফলে দাতব্য সংস্থাগুলো বলছে, আশ্রয়ের সমর্থন শেষ হওয়ার আগে অনেক শরণার্থীই বাসস্থান বা ভাতার ব্যবস্থা করতে পারছেন না।
জাতীয় গৃহহীনতা বিষয়ক সংস্থা 'ক্রাইসিস'-এর নীতি ও প্রচার প্রধান জেসমিন বাসরান বলেন, শরণার্থীদের সবকিছু গুছিয়ে নেওয়ার জন্য ২৮ দিন যথেষ্ট নয়। তিনি আরও জানান যে, শরণার্থীদের মধ্যে গৃহহীনতার হার সবচেয়ে বেশি বাড়ছে এবং প্রকৃত সংখ্যা সম্ভবত আরও অনেক বেশি, কারণ সরকারি পরিসংখ্যানে কেবল তাদেরই গণনা করা হয় যারা স্থানীয় কর্তৃপক্ষের কাছে রিপোর্ট করে।
সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, লন্ডন এবং উত্তর-পশ্চিম ইংল্যান্ডে (ম্যানচেস্টার ও লিভারপুলসহ) গৃহহীন বা গৃহহীন হওয়ার ঝুঁকিতে থাকা শরণার্থীর অনুপাত সবচেয়ে বেশি। পশ্চিম লন্ডনের হিলিংডন বরাতে সবচেয়ে তীব্র বৃদ্ধি দেখা গেছে—সেখানে ২০২৪/২৫ সালে ২,০৯৮টি শরণার্থী পরিবার গৃহহীন ছিল, যা ২০২১/২২ সালে ছিল মাত্র ৭১।
শরণার্থীদের এমন এলাকা থেকে সহায়তা নিতে হয় যেখানে তাদের 'লোকাল কানেকশন' বা স্থানীয় যোগাযোগ আছে, যা সাধারণত তাদের আগের আশ্রয় কেন্দ্রের এলাকা হয়ে থাকে। হিথ্রো বিমানবন্দরের কাছাকাছি হওয়ায় হিলিংডনে বিপুল সংখ্যক আশ্রয়প্রার্থীকে রাখা হয়।
গত ডিসেম্বরে ন্যাশনাল অডিট অফিস আশ্রয় ব্যবস্থার ওপর একটি নেতিবাচক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। সেখানে দেখা গেছে যে, সরকারের ধারাবাহিক "স্বল্পমেয়াদী ও প্রতিক্রিয়াশীল" নীতিগুলো সমস্যা সমাধানের বদলে কেবল স্থানান্তরিত করেছে, যা গৃহহীনতার মাত্রা বাড়িয়ে দিয়েছে। প্রতিবেদনে ২৮ দিনের সময়সীমা পরিবর্তন, পুরনো আবেদনের জট কমানোর চাপের ফলে আপিল বিভাগে বাড়তি চাপ সৃষ্টি এবং বিচারক স্বল্পতার কারণে আদালতের কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়ার বিষয়গুলো সমালোচনা করা হয়েছে।
গত বছর লেবার সরকার পরীক্ষামূলকভাবে এই ২৮ দিনের সময়সীমা বাড়িয়ে ৫৬ দিন করেছিল, কিন্তু গত সেপ্টেম্বরে এটি আবার ২৮ দিনে ফিরিয়ে আনা হয়। ২০২৩ সালে কিছু শরণার্থীর জন্য এই সময়সীমা কমিয়ে মাত্র ৭ দিন করা হয়েছিল। ব্রিটিশ রেড ক্রস একে "চরম দুর্দশার" কারণ হিসেবে অভিহিত করার পর সেই নীতি বাতিল করা হয়। তবে গর্ভবতী নারী, শিশুসহ পরিবার এবং প্রতিবন্ধীদের মতো ঝুঁকিপূর্ণ ব্যক্তিদের জন্য ৫৬ দিনের সময়সীমা জানুয়ারি ২০২৬ পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছিল এবং এটি এখনও কার্যকর রয়েছে বলে জানা গেছে।
হোম অফিসের সর্বশেষ তথ্য বলছে, ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এক বছরে ১ লক্ষ ১০ হাজার মানুষ আশ্রয়ের আবেদন করেছেন, যা আগের বছরের তুলনায় ১৩% বেশি।
গত বছরের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ১,০৮,০৮৫ জন মানুষ আশ্রয়ের জন্য বরাদ্দকৃত আবাসনে ছিলেন, যাদের মধ্যে ৩৬,০০০-এর বেশি ছিলেন হোটেলে এবং বাকি অধিকাংশ ছিলেন শেয়ারড হাউজিং বা এইচএমও-তে। এই আবাসন ব্যবস্থা বজায় রাখতে সরকারের শত শত কোটি পাউন্ড খরচ হয়েছে।
সরকার অঙ্গীকার করেছে যে, তারা ঝুলে থাকা আবেদনের জট কমিয়ে আনবে, প্রতিটি "অ্যাসাইলাম হোটেল" বন্ধ করবে এবং এই খাতের খরচ কমিয়ে আনবে। এছাড়া স্থানীয় সম্প্রদায়ের ওপর চাপ কমাতে আরও "উপযুক্ত" জায়গা খোঁজা হচ্ছে বলেও সরকার জানিয়েছে।
তবে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের 'গ্লোবাল এক্সচেঞ্জ অন মাইগ্রেশন অ্যান্ড ডাইভারসিটি'-র পরিচালক জ্যাকি ব্রডহেড মনে করেন, এই শরণার্থী নীতি নিয়ে একটি দীর্ঘমেয়াদী এবং নতুন চিন্তাভাবনার প্রয়োজন হতে পারে।
তিনি সমাধান হিসেবে পরামর্শ দিয়েছেন যে, হোটেলের মতো জায়গার জন্য বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে অর্থ না দিয়ে অস্থায়ী আবাসন তৈরিতে বিনিয়োগ করা উচিত। তার মতে, শুরুতে এটি আবেদনের জট সামলাতে ব্যবহৃত হলেও পরবর্তীতে তা সাধারণ আবাসন সংকট মেটাতেও সাহায্য করতে পারে।
তিনি স্থানীয় প্রশাসন এবং হোম অফিসের মধ্যে সমন্বয়ের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তিনি সতর্ক করে বলেন যে, আবেদনের বিষয়ে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ফলে আবাসন পরিষেবার ওপর "চরম মাত্রার চাপ" সৃষ্টি হতে পারে, যা আগে থেকেই বেশ নাজুক অবস্থায় রয়েছে।