শিরোনাম
ডেস্ক রিপোর্ট
প্রকাশ: ১৯:২৩, ১৭ মার্চ ২০২৬
প্রতীকি ছবি: সংগৃহীত।
ইসরায়েলি প্রতিরক্ষামন্ত্রী মঙ্গলবার জানিয়েছেন যে, রাতভর চালানো বিমান হামলায় ইরানের শীর্ষ নিরাপত্তা কর্মকর্তা এবং বিপ্লবী গার্ডের বাসিজ মিলিশিয়া প্রধান নিহত হয়েছেন। এটি ইরানের নেতৃত্বের জন্য একটি বড় আঘাত হিসেবে দেখা হচ্ছে। অন্যদিকে, তেহরানও ইসরায়েল এবং তার প্রতিবেশী উপসাগরীয় আরব দেশগুলোর দিকে নতুন করে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে, খবর ডেকান ক্রনিকলের।
ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাটজ এক বিবৃতিতে বলেছেন, শীর্ষ নিরাপত্তা কর্মকর্তা আলী লারিজানি এবং জেনারেল গোলাম রেজা সোলাইমানি উভয়কেই গত রাতে "খতম" করা হয়েছে। উল্লেখ্য যে, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের শুরু করা যুদ্ধের প্রথম দিনেই এক বিমান হামলায় ইরানের ৮৬ বছর বয়সী সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হন। তারপর থেকে ইরান সরকারের আরও বেশ কয়েকজন শীর্ষ নেতা নিহত হয়েছেন।
ইরানি রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম এখনও এই দুই মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেনি। তবে তারা জানিয়েছে যে, লারিজানির কার্যালয় থেকে শীঘ্রই একটি বার্তা প্রকাশ করা হবে। ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী ইরানের রাজধানীতে "ব্যাপক আকারে বিমান হামলা" চালানোর এবং লেবাননে ইরান সমর্থিত হিজবুল্লাহর ওপর হামলা জোরদার করার ঘোষণা দেওয়ার পর এই খবরটি সামনে এল। ইসরায়েল জানিয়েছে, ভোর হওয়ার আগে ইরান থেকে তেল আবিবসহ বিভিন্ন স্থানে দুটি ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানো হয়েছে এবং হিজবুল্লাহ ইসরায়েলের উত্তরাঞ্চলকে লক্ষ্যবস্তু করেছে।
সংযুক্ত আরব আমিরাতে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলার কারণে আন্তর্জাতিক ভ্রমণের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র দুবাইয়ের আকাশপথ সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয়। আবুধাবির আকাশে একটি ক্ষেপণাস্ত্র ভূপাতিত করার পর তার ধ্বংসাবশেষের আঘাতে একজন ব্যক্তি নিহত হন।
নিহত আলী লারিজানি ইরানের অন্যতম প্রভাবশালী রাজনৈতিক পরিবারের সন্তান। তিনি দেশটির পার্লামেন্টের সাবেক স্পিকার এবং পারমাণবিক আলোচনা বিষয়ে খামেনির জ্যেষ্ঠ নীতি উপদেষ্টা ছিলেন। অন্যদিকে, জেনারেল সোলাইমানি ছিলেন বাসিজ মিলিশিয়া বাহিনীর প্রধান। ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর মতে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইরানে অভ্যন্তরীণ বিক্ষোভ দমনে এই বাসিজ বাহিনী সোলাইমানির নেতৃত্বে ব্যাপক সহিংসতা ও গ্রেপ্তার অভিযান চালিয়েছে। সোলাইমানির মৃত্যু বাসিজ বাহিনীর কমান্ড ব্যবস্থাকে দুর্বল করে দিতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ইরান তার প্রতিবেশী দেশগুলোর জ্বালানি অবকাঠামোর ওপর চাপ অব্যাহত রেখেছে। সংযুক্ত আরব আমিরাতের ফুজাইরাহ আমিরাতের একটি তেল স্থাপনায় ড্রোন হামলা চালানো হয়েছে। যুদ্ধের শুরু থেকে এখন পর্যন্ত আরব আমিরাতে আটজন নিহত হয়েছেন। ইরানের এই হামলা এবং হরমুজ প্রণালীর ওপর তাদের নিয়ন্ত্রণ (যেখান দিয়ে বিশ্বের এক-পঞ্চমাংশ তেল পরিবহন করা হয়) বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সংকটের আশঙ্কা বাড়িয়ে দিয়েছে।
মঙ্গলবার ভোরে ফুজাইরাহ উপকূলে নোঙর করা একটি ট্যাঙ্কারে হামলা চালানো হয়। ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরান আক্রমণ করার মাধ্যমে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধ শুরু করার পর থেকে এ নিয়ে প্রায় ২০টি জাহাজ আক্রান্ত হলো। ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে এক সাক্ষাৎকারে বলেন, হরমুজ প্রণালীতে নৌ-চলাচলের ওপর চাপ বজায় রাখা ছাড়া তাদের সামনে আর কোনো পথ খোলা নেই। তিনি প্রশ্ন তোলেন, "তারা ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়বে আর আমরা কি চুপচাপ বসে থাকব?"
তেলের ক্রমবর্ধমান দাম নিয়ে ওয়াশিংটনের ওপর চাপ বাড়ছে। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী ব্রেন্ট ক্রুড তেলের দাম প্রতি ব্যারেল ১০০ ডলারের উপরে রয়েছে, যা যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ৪০% এরও বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন, তিনি প্রায় আধা ডজন দেশকে হরমুজ প্রণালী উন্মুক্ত রাখতে যুদ্ধজাহাজ পাঠানোর দাবি জানিয়েছেন। তবে তার এই আহ্বানে তাৎক্ষণিক কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি। অনেক দেশই নির্দিষ্ট কোনো সমাপ্তি পরিকল্পনা ছাড়া এই যুদ্ধে জড়াতে ইতস্ততবোধ করছে।
সংযুক্ত আরব আমিরাত মঙ্গলবার ভোরে তাদের আকাশপথ সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেয়। সামরিক বাহিনী জানায়, তারা ইরান থেকে আসা ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হুমকির মোকাবিলা করছে। পরে এই নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হলেও আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার মাধ্যমে হামলা ঠেকানোর সময় বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায়। এই পরিস্থিতি এমিরেটস এবং ইতিহাদের মতো দীর্ঘপাল্লার বিমান পরিষেবা চালু রাখার ক্ষেত্রে আমিরাত কর্তৃপক্ষের জন্য এক কঠিন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে।
সৌদি আরবের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, তারা মঙ্গলবার সকালে দেশের তেল সমৃদ্ধ পূর্বাঞ্চলীয় প্রদেশের ওপর দিয়ে আসা এক ডজন ড্রোন ভূপাতিত করেছে। কাতারের রাজধানী দোহার আকাশে ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করার সময় বিকট শব্দ শোনা যায়। দেশটির প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, তারা সফলভাবে হামলা রুখে দিলেও একটি ভূপাতিত গোলার আঘাতে শিল্প এলাকায় আগুন ধরে গেছে।
ইরাকেও ইরান-ঘনিষ্ঠ গোষ্ঠীগুলোর আক্রমণ অব্যাহত রয়েছে। বাগদাদে মার্কিন দূতাবাসে ড্রোন হামলার ফলে সৃষ্ট ধ্বংসাবশেষ এসে পড়েছে। ইরাকি কর্মকর্তাদের মতে, দূতাবাসের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা চারটি ড্রোনই গুলি করে নামাতে সক্ষম হয়েছে। এছাড়া বাগদাদের আল-জাদরিয়া এলাকার উচ্চ নিরাপত্তা সংবলিত প্রেসিডেন্সিয়াল কম্পাউন্ডের একটি বাড়িতে আলাদা একটি হামলার ঘটনা ঘটেছে। এই হামলার দায় কেউ স্বীকার না করলেও যুদ্ধের শুরু থেকেই ইরান-পন্থী মিলিশিয়ারা ইরাকের ভেতর মার্কিন লক্ষ্যবস্তুগুলোতে নিয়মিত হামলা চালিয়ে আসছে।