শিরোনাম
ডেস্ক রিপোর্ট
প্রকাশ: ১৭:৩২, ১৯ মার্চ ২০২৬
ইংল্যান্ডের এই দীর্ঘ যাত্রাপথে এটি সবচেয়ে সুন্দর ও বৈচিত্র্যময় ল্যান্ডস্কেপ মধ্য দিয়ে গেছে। ছবি: সংগৃহীত।
ইংল্যান্ডজুড়ে বিস্তৃত একটি নতুন ফুটপাথ আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করা হচ্ছে, যা পুরো দেশটির উপকূলরেখাকে সংযুক্ত করেছে।
এটি তৈরিকারী সরকারি সংস্থা 'ন্যাচারাল ইংল্যান্ড'-এর মতে, ২,৬৮৯ মাইল দীর্ঘ এই পথটি বিশ্বের দীর্ঘতম সুরক্ষিত উপকূলীয় হাঁটার পথ। এর নামটিও বেশ দীর্ঘ— 'কিং চার্লস থ্রি ইংল্যান্ড কোস্ট পাথ'। তবে এবারই প্রথম এটি একটি নিরবচ্ছিন্ন পথ তৈরি করেছে, যার ফলে পথচারীরা ধাপে ধাপে ইংল্যান্ডের পুরো উপকূলরেখা ঘুরে দেখার সুযোগ পাবেন, খবর বিবিসির।
এই দীর্ঘ যাত্রাপথে এটি দেশের সবচেয়ে সুন্দর ও বৈচিত্র্যময় ল্যান্ডস্কেপ বা ভূপ্রকৃতির মধ্য দিয়ে গেছে— যার মধ্যে রয়েছে লবণাক্ত জলাভূমি, বালুকাময় সমুদ্রসৈকত থেকে শুরু করে পাহাড়ের চূড়া (ক্লিফ), বালিয়াড়ি এবং ঐতিহাসিক উপকূলীয় শহর। এর অন্যতম প্রধান আকর্ষণ হলো পূর্ব সাসেক্সের বিখ্যাত চক পাথরের পাহাড় 'সেভেন সিস্টার্স', যা ন্যাচারাল ইংল্যান্ড ঘোষিত একটি নতুন জাতীয় প্রকৃতি সংরক্ষণের (National Nature Reserve) অংশ।
এই নতুন উপকূলীয় রুটের অনেকটা অংশ আগে থেকেই ছিল, তবে ১,০০০ মাইলেরও বেশি নতুন পথ তৈরি করা হয়েছে এবং আরও অনেক অংশ উন্নত করা হয়েছে। পথগুলোর উপরিভাগ নতুন করে সংস্কার করা হয়েছে, চলাচলের বাধা দূর করা হয়েছে এবং যেখানে প্রয়োজন সেখানে কাঠের হাঁটার পথ (বোর্ডওয়াক) ও সেতু নির্মাণ করা হয়েছে। গর্ডন ব্রাউনের সরকারের আমলে এই প্রকল্পটি শুরু হয়েছিল এবং এই পর্যায়ে পৌঁছাতে ১৮ বছর সময় ও সাতজন প্রধানমন্ত্রীর পরিবর্তন দেখতে হয়েছে।
এই রুটের প্রায় ৮০ শতাংশ এখন জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত এবং বাকি অংশের বেশিরভাগই এই বছরের শেষের দিকে শেষ হওয়ার কথা রয়েছে।
ন্যাচারাল ইংল্যান্ডের পক্ষে এই প্রকল্পের নেতৃত্বদানকারী নীল কনস্টেবল বলেন, "এটি দুর্দান্ত— এটি আমার কর্মজীবনের সেরা কাজ।" তার মতে, এই পথের দৈর্ঘ্যই মূল বিষয় নয়। বরং এর বিশেষত্ব হলো, ইংল্যান্ডের যেকোনো জায়গা থেকে আপনি উপকূলে গিয়ে বামে বা ডানে মোড় নিয়ে ইচ্ছামতো সমুদ্রের কোল ঘেঁষে হেঁটে যেতে পারবেন।
এই রুটটি তৈরির জন্য নতুন আইনের প্রয়োজন ছিল— ২০০৯ সালে পাস হওয়া 'মেরিন অ্যান্ড কোস্টাল অ্যাক্সেস অ্যাক্ট'। এর পাশাপাশি একটি পরিষ্কার ও নিরবচ্ছিন্ন পদপথ তৈরির জন্য বছরের পর বছর ধরে নিখুঁত পরিকল্পনা এবং উপকূলজুড়ে ব্যাপক কাজ করতে হয়েছে।
ন্যাচারাল ইংল্যান্ড জানিয়েছে যে, অনেক জায়গায় নতুন প্রবেশের অধিকার পাওয়ার ফলে এমন সব এলাকা জনসাধারণের জন্য খুলে গেছে যা আগে নিষিদ্ধ ছিল— যার মধ্যে সমুদ্রসৈকত, বালিয়াড়ি এবং পাহাড়ের চূড়া অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
এই পথে চলাচলের সুবিধা এমনভাবে উন্নত করা হয়েছে যাতে শারীরিক সীমাবদ্ধতা থাকা ব্যক্তিরাও ট্রেইলটির বিভিন্ন অংশ উপভোগ করতে পারেন। ফুটপাথের বিদ্যমান নেটওয়ার্কের ফাঁকগুলো এমনভাবে পূরণ করা হয়েছে যেন রুটটি পানির আরও কাছাকাছি থাকে এবং উপকূলের এমন সব অংশকে সংযুক্ত করে যা আগে কখনো একটি একক হাঁটার পথের মাধ্যমে যুক্ত ছিল না।
তবে কিছু কিছু জায়গায় পথচারীদের সাময়িকভাবে মূল পথ ছেড়ে বাইরে যেতে হয়। যেমন উত্তর-পশ্চিম ইংল্যান্ডে রুটটি অনুসরণ করতে মার্সি (Mersey) নদী পার হওয়ার জন্য ফেরি ব্যবহার করতে হয়।
দক্ষিণ ডেভনের একটি অংশ বিশেষভাবে চ্যালেঞ্জিং। সেখানে এরমে (Erme) নদীতে কোনো ব্রিজ বা ফেরি নেই এবং নদীর উজানের জমি ব্যক্তিগত মালিকানাধীন হওয়ায় সেখানে প্রবেশাধিকার নেই। তাই পথচারীদের প্যান্ট গুটিয়ে ভাটার এক ঘণ্টার মধ্যে নদী পার হতে হয়।
প্রকল্পের প্রধান কনস্টেবল বলেন, "এটি অভিজ্ঞতারই একটি অংশ।" জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে ভবিষ্যতে ভারী বৃষ্টিপাত এবং সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির কথা মাথায় রেখেই এই পথটি ডিজাইন করা হয়েছে।
ইংল্যান্ডের আইনে প্রথমবারের মতো এমন বিধান রাখা হয়েছে যাতে উপকূলীয় ভাঙন বা পরিবর্তনের ফলে রুটটিকে স্থলের দিকে সরিয়ে আনা যায়—ন্যাচারাল ইংল্যান্ড একে বলছে "রোলব্যাক" (rollback)। এটি পরিবর্তনশীল উপকূলরেখার সাথে খাপ খাইয়ে নিতে সাহায্য করবে এবং নিশ্চিত করবে যেন আগামী প্রজন্মের জন্য এই পথটি নিরবচ্ছিন্ন থাকে।
সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলো দেখিয়েছে এই রুটটি কতটা পরিবর্তনশীল হতে পারে। ফেব্রুয়ারির শুরুতে ভারী বৃষ্টির কারণে ভূমিধসে ডরসেটের চারমাউথের বাইরের ক্লিফের একটি বড় অংশ হারিয়ে যায়। সাউথ ওয়েস্ট কোস্ট পাথ টিমের প্রধান লর্না শেরিফ জানান, পথটি তখন বন্ধ করে বিকল্প রাস্তা দেওয়া হয়েছিল। সেই বিকল্প পথটি প্রায় দেড় মাইল দীর্ঘ ছিল এবং পথচারীদের রাস্তার ওপর দিয়ে হাঁটতে হতো। তবে তার টিম দ্রুত জমির মালিকের সাথে কথা বলে ১৫ মিটারের একটি "রোলব্যাক" বা পথ পরিবর্তনের ব্যবস্থা করে এবং কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই পথটি আবার খুলে দেওয়া হয়। তিনি বলেন, "এই বিধান না থাকলে এটি করতে আমাদের কয়েক মাস লেগে যেত।"
'র্যামবলার্স' (Ramblers) নামক দাতব্য সংস্থাটি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকেই ইংল্যান্ডের উপকূলে সাধারণ মানুষের অবাধ যাতায়াতের জন্য প্রচারণা চালিয়ে আসছে। সংস্থাটির পরিচালক জ্যাক কর্নিশ এই নতুন পথকে "বিপ্লবী" হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, এর ফলে ট্রেইল থেকে জোয়ারের উচ্চসীমা পর্যন্ত একটি উন্মুক্ত এলাকা তৈরি হয়েছে, যার অর্থ হলো আপনি ট্রেইল ছেড়ে সমুদ্রসৈকতে ঘুরে বেড়াতে পারবেন, পিকনিক করতে পারবেন এবং একটি দ্বীপ রাষ্ট্র হিসেবে প্রথমবারের মতো আমাদের উপকূলকে সত্যিকার অর্থে উপভোগ করতে পারবেন।
এই রুটটি পুরো ব্রিটেন দ্বীপের উপকূলজুড়ে একটি নিরবচ্ছিন্ন হাঁটার পথের সম্ভাবনাও তৈরি করেছে। ইংল্যান্ডের এই নতুন কোস্ট পাথটি 'ওয়েলস কোস্ট পাথ'-এর সাথে যুক্ত হয়েছে, যা ৮৭০ মাইল দীর্ঘ এবং ২০১২ সালে সম্পন্ন হওয়া বিশ্বের প্রথম জাতীয় উপকূলীয় পথ।
স্কটল্যান্ডে এমন কোনো একক সরকারি উপকূলীয় ট্রেইল নেই, তবে ২০ বছর আগে পাস হওয়া "রাইট টু রোম" (অবাধ বিচরণের অধিকার) আইনের কারণে সেখানকার উপকূলের অনেকটা অংশেই যাতায়াত করা যায়। স্কটল্যান্ডের মূল ভূখণ্ডের উপকূলরেখা প্রায় ৫,৫০০ মাইল বলে ধারণা করা হয়। সব মিলিয়ে পুরো ব্রিটেনের চারপাশ দিয়ে একটি নিরবচ্ছিন্ন উপকূলীয় হাঁটার পথ প্রায় ৯,০০০ মাইল দীর্ঘ হবে। প্রতিদিন গড়ে ১৫ মাইল হাঁটলে কোনো বিরতি ছাড়াই এটি শেষ করতে প্রায় দুই বছর সময় লাগবে।