শিরোনাম
ডেস্ক রিপোর্ট
প্রকাশ: ১৯:১৯, ৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | আপডেট: ১৯:২১, ৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
প্রতীকি ছবি। এঁকেছে জেমিনাই।
ইউরোপীয় ইউনিয়ন (EU) বর্তমানে এক জটিল ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতির মুখোমুখি। একদিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ওপর অতি-নির্ভরশীলতা, অন্যদিকে চীনের ক্রমবর্ধমান সামরিক ও প্রযুক্তিগত উত্থান—এই দুই শক্তির মাঝে পড়ে ইউরোপ এখন নিজের প্রতিরক্ষা খাতে 'স্বনির্ভরতা' বা 'Strategic Autonomy' অর্জনে মরিয়া। ডয়চে ভেলের এক প্রতিবেদনে এই পরিবর্তনের চিত্রটি স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে।
পরিস্থিতির প্রেক্ষাপট
দীর্ঘদিন ধরে ইউরোপীয় দেশগুলো তাদের নিরাপত্তার জন্য মূলত ন্যাটোর (NATO) ওপর এবং পরোক্ষভাবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরশীল ছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ডোনাল্ড ট্রাম্পের আমল থেকে শুরু করে বর্তমান সময় পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতির অনিশ্চয়তা ইউরোপকে ভাবিয়ে তুলেছে। এছাড়া ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর ইউরোপীয় দেশগুলো উপলব্ধি করেছে যে, তাদের নিজস্ব অস্ত্রভাণ্ডার এবং উৎপাদন ক্ষমতা বড় ধরনের যুদ্ধের জন্য যথেষ্ট নয়।
মার্কিন ও চীনা আধিপত্যের চ্যালেঞ্জ
বিশ্বের প্রতিরক্ষা বাজারের সিংহভাগ বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের দখলে। ইউরোপীয় দেশগুলো যখনই উন্নত যুদ্ধবিমান বা প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম কিনতে চায়, তারা এফ-৩৫-এর মতো মার্কিন প্রযুক্তির দিকে ঝুঁকে পড়ে। অন্যদিকে, চীন ড্রোন প্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) এবং বিরল খনিজ সম্পদের (যা অস্ত্র তৈরির জন্য অপরিহার্য) বাজারে একাধিপত্য বিস্তার করছে।
ডয়চে ভেলের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে যে, ইউরোপ যদি নিজস্ব প্রযুক্তিতে উন্নত অস্ত্র তৈরি করতে না পারে, তবে তারা কেবল ভোক্তা রাষ্ট্র হিসেবেই থেকে যাবে। এটি কেবল অর্থনৈতিক ক্ষতি নয়, বরং সার্বভৌমত্বের জন্যও বড় হুমকি।
ইউরোপের নতুন প্রতিরক্ষা কৌশল
ইইউ এখন 'ইউরোপীয় প্রতিরক্ষা শিল্প কৌশল' (EDIS) বাস্তবায়নের পথে হাঁটছে। এর মূল লক্ষ্যগুলো হলো:
যৌথ ক্রয়: সদস্য রাষ্ট্রগুলো আলাদাভাবে অস্ত্র না কিনে সম্মিলিতভাবে কিনলে খরচ কমবে এবং অস্ত্রের মান উন্নত হবে।
আভ্যন্তরীণ উৎপাদন বৃদ্ধি: ২০৩০ সালের মধ্যে ইউরোপীয় দেশগুলোর প্রতিরক্ষা বাজেটের অন্তত অর্ধেক ইউরোপের অভ্যন্তরীণ বাজার থেকে খরচ করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
গবেষণা ও উন্নয়ন: হাইপারসনিক মিসাইল, সাইবার নিরাপত্তা এবং মহাকাশ গবেষণায় বাজেট বাড়ানো।
প্রতিবন্ধকতা ও বাস্তবতা
তবে এই স্বনির্ভরতার পথ মোটেও মসৃণ নয়। জার্মানি, ফ্রান্স এবং পোল্যান্ডের মতো বড় দেশগুলোর মধ্যে প্রতিরক্ষা অগ্রাধিকার নিয়ে প্রায়ই মতবিরোধ দেখা দেয়। ফ্রান্স চায় সম্পূর্ণ ইউরোপীয় সমাধান, যেখানে জার্মানি অনেক ক্ষেত্রে মার্কিন অংশীদারিত্ব বজায় রাখতে আগ্রহী। এছাড়া, ইউরোপের প্রতিরক্ষা কলকারখানাগুলোর উৎপাদন ক্ষমতা দ্রুত বৃদ্ধি করা একটি বিশাল চ্যালেঞ্জ। কাঁচামালের জন্য এখনো তারা চীনের ওপর এবং উচ্চ প্রযুক্তির জন্য যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরশীল।
ডয়চে ভেলের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ইউরোপ বুঝতে পেরেছে যে আটলান্টিকের ওপারের বন্ধুর (যুক্তরাষ্ট্র) ওপর সবসময় ভরসা করা ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। মার্কিন ও চীনা আধিপত্যের মাঝখানে নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে হলে ইউরোপকে কেবল একটি অর্থনৈতিক ব্লক নয়, বরং একটি সামরিক শক্তিতেও রূপান্তরিত হতে হবে। এটি কোনো বিলাসিতা নয়, বরং বর্তমান বিশ্বের বাস্তবতায় ইউরোপের জন্য টিকে থাকার লড়াই।